মন্ত্রীর বক্তব্যে ‘আদিবাসী’ শব্দ, সতর্কতা অবলম্বনে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র সংসদের দাবি


বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী দল কর্তৃক আয়োজিত একটি মতবিনিময় সভায় স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কর্তৃক অসতর্কতাবশত উচ্চারিত ‘আদিবাসী’ শব্দ পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন করে আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল শব্দ ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বনে মাননীয় মন্ত্রীর নিকট অনুরোধ জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র সংসদ।
এ বিষয়ে ১ এপ্রিল সংগঠনটির নেতারা জানান যে, সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী দল কর্তৃক আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বিভিন্ন জাতিসত্তা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সভায় মাননীয় মন্ত্রী অনিচ্ছাকৃতভাবে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীগুলোকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে সম্বোধন করেন, যা পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীর দৃষ্টিগোচর হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও সংবেদনশীলতা সৃষ্টি হয়েছে ।
নেতারা আরো বলেন যে, বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র, যেখানে সকল নাগরিক সমান মর্যাদা ও অধিকারের অধিকারী | এ প্রেক্ষাপটে “ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী”, “উপজাতি” বা “ ethnic communities” শব্দগুলো সরকারিভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অন্যদিকে “আদিবাসী” শব্দটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে, বিশেষ করে ইউনাইটেড ন্যাশনস ২০০৭ সাল থেকে প্রচার করে আসছে। যা একটি সংবেদনশীল ও বিতর্কিত পরিভাষা । যার দরুন বিভিন্ন ঘটনার পরিপেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে আদিবাসী শব্দ ব্যবহারে যথাযথ সংযম ও সতর্কতা প্রদর্শনের উপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। যাতে জাতীয় ঐক্য অক্ষুন্ন রাখার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও অধিকার নিয়ে যেনো বিভ্রান্তি বা অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের উদ্ভব না ঘটে।
সংগঠনটি বলছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত দিক থেকে একটি স্পর্শকাতর এলাকা হিসেবে বিবেচিত। ইতিমধ্যে সেখানে জাতিগত বিবেদ, জুম্মল্যান্ড নামক আলাদা রাষ্ট্র গঠনের দাবি, একই অঞ্চলে বসবাসরত বাঙালি ও নিরাপত্তার স্বার্থে অবস্থানরত সেনাবাহিনীদের উচ্ছেদের দাবি সহ নানা বিতর্কিত দাবি উত্তরণ করা হয়েছে। যা একটি স্বাধীন দেশে মোটেও কাম্য নয়। অপরদিকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৩(ক)-এ সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে উপজাতি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, আদিবাসী নয়।
নেতৃবৃন্দ বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, অসাবধানতাবশত ব্যবহৃত কোনো শব্দ বা পরিভাষা যেন কোনোভাবেই বিভ্রান্তি, ভুল ব্যাখ্যা বা অপ্রত্যাশিত বিতর্কের জন্ম না দেয়। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, বিভিন্ন দেশে অভ্যন্তরীণ সংবেদনশীল বিষয়গুলো ভুলভাবে উপস্থাপিত হলে তা দীর্ঘমেয়াদে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
এ বিষয়ে সংগঠনটি কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে। আর তা হলো- এক. পার্বত্য অঞ্চলে যেকোনো কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, সংবিধান ও সামাজিক সম্প্রীতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। দুই. স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। তিন. কোনো ধরনের বিভ্রান্তিমূলক প্রচার, জবরদস্তিমূলক প্রভাব বা অস্বচ্ছ কার্যক্রম থাকলে তা যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন এবং চার. সর্বোপরি, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকল মহলের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকে এই ছাত্র সংগঠনটি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীর নিকট ভবিষ্যতে এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে বক্তব্য প্রদানকালে বিতর্কিত পরিভাষা ব্যবহারে আরও সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ জানিয়েছে। সংগঠনের নেতারা আরো আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, দেশের সার্বভৌমত্ব, সংহতি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকল মহল সচেতন ভূমিকা পালন করবেন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংবেদনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

















