আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস

ঝুলে আছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন : দিশেহারা স্থানীয়রা

fec-image

আজ ২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে এ দিবসটি পালন করা হয়। বাংলাদেশেও দিবসটি পালন হচ্ছে আজ। বিশেষ করে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত উখিয়া-টেকনাফে এ দিবসকে ঘিরে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন হচ্ছে।

কয়েক যুগ ধরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন সমস্যা ঝুলে থাকায় উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থানরত প্রায় রেজিস্ট্রাটসহ ১৩ লাখেরও বেশী শরণার্থী অনিশ্চিত জীবন যাপন করছে। তবে তাদের ঘিরে দাতা সংস্থা ও এনজিওরা ফায়দা হাসিল করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ বারবার। এ অবস্থায় সরকারও অনেকটা নিরুপায় হয়ে পড়েছে। চেয়ে আছে জাতিসংঘের দিকে।

বাংলাদেশ মানবিক দিক বিবেচনা করে প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে আসা কক্সবাজারের সীমান্ত এলাকায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে এখন দীর্ঘমেয়াদী বহুমূখী সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। প্রায় ১৬ কোটি বাংলাদেশির মধ্যে কক্সবাজারের প্রায় (বৈধ-অবৈধ) মিলিয়ে ১৩ লাখের অধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী বছরের পর বছর ধরে অবস্থান করছে। এর বাইরে মিয়ানমারের আরো কয়েক লাখ নাগরিক বাংলাদেশে অবৈধভাবে আছে। তবুও প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের উপর বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের চাপ রয়েছে ।

বিশেষ করে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে নতুন করে আসা বানের স্রোতের মত রোহিঙ্গারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সম্প্রতিক বছর গুলোতে মিয়ানমার সরকার দৃশ্যমান এমন কোন উদ্যোগ নেয়নি যার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে তাদের নাগরিকরা স্বদেশে ফিরে যেতে পারে।

আবার বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সময়ে সাগরপথে ভয়ংকর যাত্রা মোকাবিলায় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের আহবানে মিয়ানমার যেভাবে ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাতে এ সমস্যার সমাধান নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান সময়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসে আইডি কার্ড, পাসপোর্টসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা নিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাচ্ছে। অথচ প্রতি কদমে কদমে হয়রানীর শিকার হচ্ছে স্থানীয়রা। বিশেষ করে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় নাগরিকরা আইডি কার্ড পকেটে রেখে চলাচলসহ হামলারও শিকার হচ্ছে। এভাবে তো চলতে পারেনা প্রায়’শ অভিমত ব্যক্ত করছেন সচেতনমহল।

বর্তমানে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান যে মিয়ানমারের তা এখন আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ও স্বীকার করে। অভ্যন্তরীন পরিস্থিতি উন্নয়ন বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। কিন্তু মিয়ানমার এ ক্ষেত্রে তেমন সাড়া দিচ্ছে না।

জানা গেছে, মিয়ানমার ২০০৫ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধ রেখেছে। সেই সময় থেকেই মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের বিষয়টি তুলে আসছে। মিয়ানমার বরাবরই ইতিবাচক আশ্বাস দিলেও গত কয়েকযুগ ধরে একজন রোহিঙ্গা শরণার্থীকেও ফিরিয়ে নেয়নি। বরং আরো হুমকি দিচ্ছে ফিরিয়ে না নেওয়ার।

গত বছর মিয়ানমারের পক্ষ থেকে তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়া দুই হাজার ৪১৫ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। সেদিন যথারীতি বালুখালী ট্রানজিট পয়েন্টে সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা ছিল। কিন্তু অসাধু এনজিওদের প্ররোচনায় প্রত্যাবাসনের তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের কৌশলে সরিয়ে নেয়। এমনকি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের ঘরগুলোতে তালা লাগিয়ে বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করে। ওইদিন রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের অভ্যন্তরে বিক্ষোভ মিছিল পর্যন্ত করে। তাদের দাবী একটাই-সেদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান, পূর্বের ঘর-বাড়ি ফেরতসহ বিভিন্ন দাবী-দাওয়া পুরন করে বাস্তবায়ন দেখালে তারপর ফিরে যাবে।

এছাড়া কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া ১৩ লাখ (বৈধ-অবৈধ) রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের ওপরই ভরসা রেখে আসছিল। কিন্তু এতে ফল না হওয়ায় বাংলাদেশ ওই উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও শরণাপন্ন হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওআইসি সম্মেলন, চীনসহ বিভিন্ন দেশের প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপ্রতিদের সাথে দ্বি-পাক্ষীয় সম্মেলনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি তুলে ধরেন।

এদিকে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার কারণে উখিয়া ও টেকনাফসহ পুরো কক্সবাজার জেলায় দেখা দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ নানা সামাজিক অস্থিরতা। স্থানীয়রা বলছেন, এরা ইয়াবা ও মানবপাচার এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন অতি জরুরী বলে মনে করেন তারা।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গারা শেষ করে ফেলছে এদেশকে। তারা ইয়াবা, মানব পাচারের মতো বড় বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাই আমাদের দেশ থেকে তাদেরকে পাঠিয়ে দেয়া হউক। আর না হয় একদিন উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় মানুষকে প্রত্যাবাসন করতে বাধ্য করবে তারা। মানবতা দেখিয়ে এখন যেভাবে বাংলাদেশের উপর গজব নেমে আসছে সেটা রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

অপরদিকে এসব বিষয়ে স্থানীয় ইউএনএইচসিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহ এবং শরণার্থীদের ছাড়পত্র না দেয়ার কারণে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কার্যক্রম করা যাচ্ছেনা। ইউএনএইচসিআরের মতে প্রত্যাবাসন কার্যক্রমটি অবশ্যই শরণার্থীদের স্বেচ্ছায় এবং শান্তিপূর্ণভাবে হতে হবে।

এই বিপুল সংখ্যক বৈধ অবৈধ রোহিঙ্গার কারনে কক্সবাজারে দেখা দিয়েছে আইন শৃংখলা অবনতিসহ নানা সামাজিক অস্থিরতা। এতে উদ্বিগ্ন এখানকার সাধারণ মানুষ। অবিলম্বে তাই রোহিঙ্গা শরনার্থী প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করার তাগিদ স্থানীয়দের। এদিকে স্থানীয় বাজারে নিত্যপণ্য সংকট ও শ্রমবাজার অনেকটা রোহিঙ্গাদের দখলে চলে গেছে। বাজারমূল্য কোনভাবেই স্থিতিবস্থা নেই। সমস্ত এলাকায় যানবাহন সংকট দেখা দিয়েছে। আবার সড়কে গাড়িও চালাচ্ছে রোহিঙ্গারা। স্থানীয় লোকজন অসহায় হয়ে পড়েছে।

রোহিঙ্গাদের কারণে আশপাশের বাংলাদেশি জনবসতি গুলোতে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতিসহ নানা সমস্যা-সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে বলে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো: কামাল হোসেন বলেন, সরকার এ বিষয় কে গুরুত্ব সহকারে দেখছে। বর্তমান সরকার দ্বি-পাক্ষিক ভিত্তিতে কুঠনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করবে এমনটা মনে করেন দীর্ঘদিনের শরণার্থী সমস্যা নিয়ে জর্জরিত বাংলাদেশের এই অঞ্চলের মানুষ।

প্রসঙ্গত, ১৯৯২ সালের শুরুর দিকে মিয়ানমারে তৎকালিন সামরিক জান্তা সরকারের অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়ে ২ লাখ ৫২ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে চলে এসেছিল। পরবর্তীতে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের মধ্যস্থতায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জন শরণার্থী স্বদেশে ফিরে গেলেও মিয়ানমার সরকারের ছাড়পত্র না দেয়ার কারণে আরো ২৫ হাজার শরণাথী স্বদেশে ফেরৎ যায়নি। সর্বশেষ ২০০৫ সালে কিছু শরণার্থী দল স্বদেশে গিয়েছিল। আবার অনেক শরণার্থী স্বদেশে ফিরে গিয়েও সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে দিয়ে অনুপ্রবেশ করে আবার বাংলাদেশে ফিরে আসে। গত ৫ বছরে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে দিয়ে ফিরে আসা রোহিংঙ্গাদের মধ্যে ৫০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা অবৈধভাবে অবস্থান করছে কুতুপালং শরনার্থী শিবির সংলগ্ন ৪/৫ টি পাহাড়ে এবং নয়াপাড়া ক্যাম্প সংলগ্ন লেদা গ্রামে বাসা তৈরি অবস্থান করছে প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গা। এরা সবাই আনরেজিষ্ট্রার্ড শরণার্থী হিসাবে পরিচিত। এরপর ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসে। বর্তমানে রাজার হালতে উখিয়া-টেকনাফের ৩০ টি ক্যাম্পে অবস্থান করছে। তাদের জন্য কেটে ফেলা হয়েছে বন-জঙ্গল আর গাছ-গাছালি।

ঘটনাপ্রবাহ: রোহিঙ্গা, শরণার্থী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × 4 =

আরও পড়ুন