রশি বেঁধে মা-মেয়েকে নির্যাতন

অভিযুক্ত চেয়ারম্যান মিরানসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা

fec-image

চকরিয়ায় আলোচিত গরু চুরির অপবাদে মা-মেয়েসহ ৫ জনকে রশি দিয়ে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলামসহ ৪ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২০/৩০জনকে আসামি দেখিয়ে মঙ্গলবার (২৫ আগষ্ট) বিকেলে থানায় মামলা (নং-২২) জিআর ৩৫৭।

অপর আসামীরা হলেন, হারবাংয়ের মাহবুবুল হক এর ছেলে নজরুল ইসলাম, ইমরান হোসেনের পুত্র জসিম উদ্দিন, জিয়াবুল হকের পুত্র নাছির উদ্দীন। বর্তমানে তারা জেল হাজতে রয়েছে। মামলা দায়ের করেন নির্যাতিত ভিকটিম পারভিন আক্তার (৪০)।

তিনি (বাদী) চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার আদিলপুর গ্রামের মৃত আবুল কালামের স্ত্রী। তারা বর্তমানে পটিয়া উপজেলার ৬নং ইউপির ৯নং ওয়ার্ডের শান্তিরহাট কুসুমপুর শহীদের বাড়ির ভাড়াবাসায় থাকেন। (২১ আগষ্ট) চকরিয়ার হারবাং ইউনিয়নে কথিত গরু চুরির অভিযোগে মা-মেয়েসহ পাঁচজনকে রশি দিয়ে বেঁধে নির্যাতন করে কিছু অতিউৎসাহী লোকজন। পরে তাদের রশি দিয়ে বেঁধে প্রকাশ্য সড়কে ঘুরিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে আসা হলে ইউপির চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলাম মিরানের নেতৃত্বে দ্বিতীয় দফায় তাদের মারধরসহ লাঞ্ছনা করা হয়।

এমনকি চেয়ারম্যানের নির্দেশে কথিত গরু চুরির মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে পুলিশ তাদেরকে জেল হাজতেও প্রেরণ করেন। ঘটনার একদিন পর মা-মেয়েকে রশি দিয়ে বেঁধে নির্যাতনের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে পুরো দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।

প্রাপ্ত তথ্যে ও মামলার বাদী পারভিন আক্তার জানান, ২ বছর পূর্বে তার স্বামী আবুল কালাম মারা যান। সংসারে ২ ছেলে ও ৫ মেয়ে রয়েছে। ছোট মেয়ে বেবি আক্তারের শ্বশুড় বাড়ি চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাট হাইদারনাশি গ্রামের উদ্দেশ্যে গত ২১ আগস্ট (শুক্রবার) ছেলে এমরান ও তার বন্ধু ছুট্টো এবং দুই মেয়ে রোজিনা আক্তার ও সেলিনা আক্তার সেলিসহ ভাড়াবাসা পটিয়া শান্তিরহাট থেকে মাইক্রোবাস যোগে সাতকানিয়া কেরানিহাট পর্যন্ত আসেন।

তিনি জানান, তারা কেরানিহাট থেকে সিএনজি অটোরিক্সা ভাড়া নিয়ে মেইন রোড দিয়ে চকরিয়া আসার পথে দুপুর ১.৩০টায় চকরিয়া মহাসড়কের হারবাং বৃন্দাবনখিল লালব্রীজ এলাকায় পৌঁছলে দুইটি মোটর সাইকেলে করে ৬ জন লোক অতর্কিত অবস্থায় আমাদেরকে আক্রমন করে সিএনজি অটোরিক্সা ধাওয়া করতে থাকে। এক পর্যায়ে সিএনজি চালক ভয় পেয়ে হারবাং স্টেশন থেকে পশ্চিম দিকে রাস্তা দিয়ে চলতে শুরু করে। কিন্তু মোটরসাইকেলে থাকা ৬জনসহ আরো লোকজন সিএনজি গাড়ীটি ধাওয়া করে হারবাং দক্ষিণ পহরচাঁদা এলাকা দিয়ে নির্মানাধীন রেললাইনের রাস্তার পাশে এনে আমাদেরকে আটক করে।

তারা (মা-মেয়েসহ ৫জন) সিএনজি থেকে নেমে শোরচিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়। এসময় আমাদেরকে পেছনে ধাওয়া করে আসা মোটর সাইকেল আরোহিরাসহ আরো কয়েকজন অজ্ঞাতনামা লোকজন ঘটনাস্থলে পৌছে আমাদেরকে আটক করে এবং ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। ওই সময় মোটরসাইকেলে করে আসা লোকজন ও অজ্ঞাত লোকজন আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যে গরু চুরির অপবাদ দিয়ে মা-মেয়েসহ ৫জনকে বেধম মারধর, শ্লীলতাহানী ও নির্যাতন করে। এক পর্যায়ে আমাদের কাছে থাকা ব্যবহৃত স্বর্ণালংকার, নগদ ৫০ হাজার টাকা ও মোবাইল সেট লুট করে নিয়ে ফেলে। এরপর তাদেরকে চুরির মিথ্যা অপবাদে কোমড়ে রশি দিয়ে বেঁধে বিভিন্ন ধরণের মানহানীকর, আপত্তিকর ও অশ্লীল গালিগালাজ দিয়ে রাস্তায় ঘুরিয়ে চেয়ারম্যানের নির্দেশে বিকাল ৫.৩০টায় ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়ে নিয়ে আসে।

ঘটনার বিবরণে বাদী পারভীন আক্তার আরো জানান, চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলাম আমাদের কোন কথা না শুনে ইউপি কার্যালয়ে দ্বিতীয় দফায় আমাদেরকে কাঠের চেয়ার ও লাঠি দিয়ে মারধর ও নির্যাতন করেন। এক পর্যায়ে আমার মেয়ে সেলিনা আক্তার সেলির তলপেটে লাথি মারে এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজও করে।

প্রাপ্ত তথ্যে আরও জানাগেছে, চুরির অপবাদে চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলামের নির্দেশে মা পারভিন আক্তার (৪০), ছেলে মো. এমরান (২১), তার বন্ধু ছুট্টো (৩৫), দুই মেয়ে সেলিনা আক্তার সেলি (২৮) ও রোজিনা আক্তার (২৩)কে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। কথিত গরুর বাছুরের মালিক দাবীদার মাহবুবুল আলমকে দিয়ে থানায় সাজানো একটি মামলা করেন। ওই মামলায় পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে গত শনিবার (২২ আগষ্ট) জেল হাজতে প্রেরণ করেন।

চকরিয়া আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট মো: ইলিয়াছ আরিফ জানান, রোববার সন্ধ্যায় ঘটনাটি তুলে ধরে চকরিয়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক রাজিব কুমার দেবের আদালতে আসামিদের জামিনের জন্য প্রার্থনা করেন তার নেতৃত্বে কোর্টের আইনজীবীরা। এ সময় আদালতের বিজ্ঞ বিচারক আসামীদের আদালতে উপস্থিত করার জন্য নির্দেশ দেন। পরে পুলিশ ২৪ আগস্ট(সোমবার) সকালে মা পারভীন আক্তার (৪০), মেয়ে সেলিনা আক্তার সেলি (২৮) ও রোজিনা আক্তার (২৩)সহ ৫জনকে আদালতে উপস্থিত করেন। এ সময় আদালত মা-মেয়েসহ তিনজনকে জামিন দেন। অন্যদের দুই জনের জামিন না মনজুর করে জেলহাজতে প্রেরন করার নির্দেশ দেন। তারা হলো- মো. ছুট্টো (২৭) পিতা: দেলোয়ার হোসেন, মো. এমরান (২১) মৃত: আবুল কালাম।

এদিকে, মা ও দুই মেয়েসহ ৫জনকে রশি বেঁধে নির্যাতনের ঘটনা গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়লে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। এমনকি বিষয়টি ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া, জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পত্রিকা এবং অনলাইন মাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হলে বিষয়টি চকরিয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাজিব কুমার দেব এর নজরে আসে। তিনি জনস্বার্থে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি মামলা গ্রহণ করেন। মামলাটি চকরিয়া সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার কাজী মতিউল ইসলামকে ৭ কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেন। নির্দেশনা পাওয়ার পর তিনি ঘটনাস্থলে সরে জমিনে তদন্তও শুরু করেছেন।

অপরদিকে, মা ও দুই মেয়েসহ ৫ জনকে রশি বেঁধে নির্যাতনের ঘটনার বিষয়টি ইলেক্ট্রনিক্স, প্রিন্ট মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটিতে কক্সবাজারের স্থানীয় সরকার বিভাগের ডিডিএলজি (উপ-সচিব) শ্রাবস্তি রায়’কে আহ্বায়ক ও চকরিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) তানভীর হোসেন এবং হারবাং ইউনিয়নের উপজেলা ট্যাগ অফিসারকে তদন্ত কমিটির সদস্য করা হয়েছে। তাদেরকে তিন কার্যদিবসের প্রতি মধ্যে সরে জমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেন। এর প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গত ২৪ আগস্ট (সোমবার) সরে জমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ করেন।

এছাড়াও চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ শামসুল তাবরীজ নিজেও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত কাজ শুরু করেন। ভুক্তভোগীদের আইনী সহায়তা দেয়া ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশনের সহকারী ডাইরেক্টর মো. শাহ পরাণ বলেন, এটি একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা। এই ধরনের ঘটনা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায়না। এজন্য আমাদের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে এইজন্য আমরা একজন আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছি। চকরিয়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আইনজীবী ও এপিপি অ্যাডভোকেট শহিদুল্লাহ এই মামলাটি পরিচালনা করবেন বলেও তিনি জানান।

চকরিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, হারবাংয়ে মা-মেয়েসহ পাঁচজনকে রশি দিয়ে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনায় ভুক্তভোগী পারভীন আক্তার বাদি হয়ে থানায় একটি এজাহার দায়ের করেন। ওই এজাহারটি মামলা হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এই মামলায় ইতোমধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে তারা জেল হাজতে রয়েছে। এই মামলার অন্যতম আসামি চেয়ারম্যান মিরানুল ইসলামকে গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five + 3 =

আরও পড়ুন