পার্বত্য চট্টগ্রামে ডেঙ্গু প্রতিরোধ

fec-image

"ন্যাপথলিন বা কর্পূরের গুড়া বেশ ভাল কীটনাশক।  নারিকেল তেলের সাথে কর্পূরের গুড়া মিশালে মশা নিবারনে তা আরো বেশি কার্যকর হতে পারে।" এছাড়া কড়া গন্ধ থাকায় নারিকেল তেলের বদলে সরিষার তেলও মশা দূরে থাকতে কার্যকর হতে পারে।

 

সৈয়দ ইবনে রহমত:

রাজধানী ঢাকাতে প্রকোপ ভয়াবহ হলেও ডেঙ্গু এখন সারা দেশের জন্যই আতঙ্ক। পার্বত্য চট্টগ্রামও এ আতঙ্কের বাইরে নয়। গত বুধবার (৭ আগস্ট ২০১৯) সন্ধ্যা পর্যন্ত পাওয়া খবরে জানা গেছে পার্বত্য বান্দরবান জেলায় ৮ জন, রাঙ্গামাটি জেলায় ২০ জন এবং খাগড়াছড়ি জেলায় ৪৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন, কেউ কেউ খাগড়াছড়ি সদর এবং রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কয়েকজন উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে আছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়া রোগীদের একটা বড় অংশ ঢাকা বা অন্যান্য স্থান থেকে আক্রান্ত হয়ে এলাকায় গিয়েছেন। তবে স্থানীয়ভাবেও কেউ কেউ আক্রান্ত হয়েছেন- এটাই ভয়ের কথা। কারণ, এমনও দেখা গেছে, রোগী সাম্প্রতিক সময়ে এলাকার বাইরে যাননি। এমনকি তার বাড়ির অন্য কেউ এলাকার বাইরে ছিল না। তারপরও তিনি আক্রান্ত হয়েছেন।

তার মানে হচ্ছে, পরিমাণে কম হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে আগে থেকেই এডিস মশা এবং ডেঙ্গুর জীবাণু আছে। ঈদুল আজহার ছুটিতে পার্বত্য জেলাগুলোতে বিপুল সংখ্যক মানুষের আনাগোনা হবে, এমনকি ঈদের ছুটি কাটাতেও অনেকে পার্বত্য জেলাগুলোর পর্যটন স্পটগুলোতে ভিড় করবেন। তাদের কারো কারো শরীরে ডেঙ্গুর জীবাণু থাকা অস্বাভাবিক না। সব মিলিয়ে আগামী দিনগুলোতে পার্বত্যাঞ্চলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। আরো ভয়ের কথা হলো, পার্বত্য এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসক এবং হাসপাতাল বা চিকিৎসা সেবাকেন্দ্র নেই। বিশেষ করে দুর্গম এলাকাগুলোর অবস্থা তো আরো সংকটজনক। এই অবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামে যাতে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়তে না পারে সে জন্য ইতোমধ্যে প্রশাসনিকভাবে কিছু কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ক্রাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার উৎস ধ্বংস করা হচ্ছে। জেলা সদর, উপজেলা সদরগুলো এক্ষেত্রে কিছুটা সফল হলেও গ্রাম, পাড়া বা মহল্লা পর্যায়ে প্রশাসনিক তৎপড়তা সেভাবে এখনো পৌঁছেনি। চিকিৎসক সংকট কাটানোর তাৎক্ষণিক কোনো সমাধানও প্রশাসনের পক্ষে সম্ভব না। নিবন্ধ লেখা (৮ আগস্ট সন্ধ্যা) পর্যন্ত সবগুলো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু টেস্টের কিট পৌঁছেনি। এই অবস্থায় প্রশাসনিক উদ্যোগগুলো আরো বেগবান হবে বলে জোর দাবি জানাই। পাশাপাশি আতঙ্কিত না হয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিজেদের কর্তব্য স্থির করে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা:

একটু সচেতন হলেই ডেঙ্গু থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব। কারণ, ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা কোনো সুস্থ মানুষকে কামড়ালেই কেবল তার ডেঙ্গু হতে পারে। অন্যকোনো উপায়ে কারো ডেঙ্গু হওয়ার আশঙ্কা নেই। এমনকি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মায়ের বুকের দুধ খেলে শিশুরও ডেঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই ডেঙ্গু রোগী দেখলেই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আতঙ্কিত হতে হবে তখনই, যখন এডিস মশা থাকবে আপনার আশেপাশে। তাই আসুন, ডেঙ্গু থেকে নিজেকে এবং পরিবার-পরিজনকে বাঁচাতে এডিস মশা, এডিস মশার আবাস্থল এবং এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস করি। এডিস মশা সাধারণত বাড়ি-ঘরেই থাকে, বাড়ির আশপাশেও থাকতে পারে। ডিম পাড়ে বিভিন্ন গর্তে, পলিথিনে, গাছের কোটরে, কৌটায়, ডাবের খোসা বা অন্যকোনো কিছুতে জমে থাকা স্থির পানিতে। ঘরের কোণায়-কাণায় আলো-আঁধারিতে লুকিয়ে থাকে এডিস মশা। তাই এডিস মশার হাত থেকে বাঁচতে হলে বাড়ি-ঘর যেমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, তেমনি আসে পাশের ঝোপঝার, জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করতে হবে। বাড়ির আশেপাশে কোথাও পানি জমে আছে কিনা ভালো করে দেখতে হবে। কোথাও জমা পানি দেখলেই সেটা পরিষ্কার করে দিতে হবে। তাহলেই আপনি নিজেকে অনেকটা নিরাপদ ভাবতে পারেন। তবে শুধু আপনি আপনার বাড়ি পরিষ্কার রাখলেই চলবে না, বরং আপনার প্রতিবেশীকেও এব্যাপারে সচেতন করতে হবে। সে যেন তার বাড়ির আশপাশও পরিষ্কার রাখে।

সচেতনতা বাড়াবেন কীভাবে?

সবাই তো সমান সচেতন না। কিন্তু একজনের অবহেলার কারণেও এডিস মশার উৎপাত সৃষ্টি হতে পারে, পুরো পাড়া বা মহল্লার মানুষের মাঝে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই যিনি সচেতন তার কর্তব্য হচ্ছে অন্যদের সচেতন করা, প্রতিবেশীদের বাড়ি-ঘর এবং আশপাশ পরিষ্কার রাখতে উৎসাহ দিয়ে সেটা নিশ্চিৎ করা। এ কাজে এলাকার চেয়ারম্যান, মেম্বার, মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, ছাত্র-শিক্ষক, হেডম্যান, কারবারিরা উদ্যোগ নিয়ে, পরামর্শ দিয়ে সকলকে তাদের বাড়ি-ঘরের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে উৎসাহ দিতে পারেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও এগিয়ে আসতে পারেন জনগণকে এডিস মশার উৎস ধ্বংস করতে উৎসাহ দিতে। বিশেষ করে ছাত্র নেতারা এক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করার সময় এসেছে এখন। পাশাপাশি প্রতিটি এলাকাতেই বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন আছে, সেসব সংগঠনের নেতাকর্মীদের সামনেও এখন সুযোগ এসেছে মানুষের সেবা করার। তারা নিজেদের বাড়ি-ঘর যেমন পরিচ্ছন্ন রাখবেন, তেমনি অন্যদেরও উৎসাহ দেবেন যাতে সবাই তাদের বাড়ি-ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন। তাহলেই কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামকে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা যাবে।

আসুন, সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে, নিজেদের কাজটাই আগে করি। সবাই মিলে নিজেরদের বাড়ি-ঘর এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা নির্মূল করি।

ডেঙ্গু জ্বর সম্পর্কে বিবিসি বাংলার ১০টি তথ্য

১. ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো কী?

সাধারণভাবে ডেঙ্গুর লক্ষণ হচ্ছে জ্বর।  ১০১ ডিগ্রি থেকে ১০২ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকতে পারে।  জ্বর একটানা থাকতে পারে, আবার ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে দেবার পর আবারো জ্বর আসতে পারে।  এর সাথে শরীরে ব্যথা মাথাব্যথা, চেখের পেছনে ব্যথা এবং চামড়ায় লালচে দাগ (র‌্যাশ) হতে পারে।  তবে এগুলো না থাকলেও ডেঙ্গু হতে পারে।

২. জ্বর হলেই কি চিন্তিত হবেন?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ বলছেন, এখন যেহেতু ডেঙ্গুর সময়, সেজন্য জ্বর হল অবহেলা করা উচিত নয়। তিনি বলছেন, ”ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে যারা মারা গেছেন, তারা জ্বরকে অবহেলা করেছেন। জ্বরের সাথে যদি সর্দি- কাশি, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া কিংবা অন্য কোন বিষয় জড়িত থাকে তাহলে সেটি ডেঙ্গু না হয়ে অন্যকিছু হতে পারে। তবে জ্বর হলেই সচেতন থাকতে হবে।”

৩. বিশ্রামে থাকতে হবে

সরকারের কমিউনিক্যাবল ডিজিজ কন্ট্রোল বা সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক ড. সানিয়া তাহমিনা বলেন, ”জ্বর হলে বিশ্রামে থাকতে হবে।  জ্বর নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করা উচিত নয়।  একজন ব্যক্তি সাধারণত প্রতিদিন যেসব পরিশ্রমের কাজ করে, সেগুলো না করাই ভালো।  পরিপূর্ণ বিশ্রাম প্রয়োজন।”

৪. কী খাবেন?

প্রচুর পরিমাণে তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।  যেমন – ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের জুস এবং খাবার স্যালাইন গ্রহণ করা যেতে পারে।  এমন নয় যে প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে, পানি জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।

৫. যেসব ঔষধ খাওয়া উচিত নয়

অধ্যাপক তাহমিনা বলেন, ”ডেঙ্গু জ্বর হলে প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে। স্বাভাবিক ওজনের একজন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি প্রতিদিন সর্বোচ্চ চারটি প্যারাসিটামল খেতে পারবে।” প্যারাসিটামলের সর্বোচ্চ ডোজ হচ্ছে প্রতিদিন চার গ্রাম। কিন্তু কোন ব্যক্তির যদি লিভার, হার্ট এবং কিডনি সংক্রান্ত জটিলতা থাকে, তাহলে প্যারাসিটামল সেবনের আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।  ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে গায়ে ব্যথার জন্য অ্যাসপিরিন জাতীয় ঔষধ খাওয়া যাবে না।  ডেঙ্গুর সময় অ্যাসপিরিন জাতীয় ঔষধ গ্রহণ করলে রক্তক্ষরণ হতে পারে।

৬. প্ল্যাটিলেট বা রক্তকণিকা নিয়ে চিন্তিত?

ডেঙ্গু জ্বরের ক্ষেত্রে প্ল্যাটিলেট বা রক্তকণিকা এখন আর মূল ফ্যাক্টর নয় বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক তাহমিনা।  তিনি বলেন, ”প্ল্যাটিলেট কাউন্ট নিয়ে উদ্বিগ্ন হবার কোন প্রয়োজন নেই। বিষয়টি চিকিৎসকের উপর ছেড়ে দেয়াই ভালো।” সাধারণত একজন মানুষের রক্তে প্ল্যাটিলেট কাউন্ট থাকে দেড়-লাখ থেকে সাড়ে চার-লাখ পর্যন্ত।

৭. ডেঙ্গু হলেই কি হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়?

ডেঙ্গু জ্বরের তিনটি ভাগ রয়েছে।  এ ভাগগুলো হচ্ছে – ‘এ’, ‘বি’ এবং ‘সি’।  প্রথম ক্যাটাগরির রোগীরা নরমাল থাকে।  তাদের শুধু জ্বর থাকে। অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগী ‘এ’ ক্যাটাগরির।  তাদের হাসপাতালে ভর্তি হবার কোন প্রয়োজন নেই। ‘বি’ ক্যাটাগরির ডেঙ্গু রোগীদের সবই স্বাভাবিক থাকে, কিন্তু শরীরে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়।  যেমন তার পেটে ব্যথা হতে পারে, বমি হতে পারে প্রচুর কিংবা সে কিছুই খেতে পারছে না। অনেক সময় দেখা যায়, দুইদিন জ্বরের পরে শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়। এক্ষেত্রে হাসপাতাল ভর্তি হওয়াই ভালো।  ‘সি’ ক্যাটাগরির ডেঙ্গু জ্বর সবচেয়ে খারাপ। কিছু-কিছু ক্ষেত্রে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ’র প্রয়োজন হতে পারে।

৮. ডেঙ্গুর জ্বরের সময়কাল

সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ থাকে। কারণ এ সময়টিতে এডিস মশার বিস্তার ঘটে।  কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে ডেঙ্গু জ্বরের সময়কাল আরো এগিয়ে এসেছে।  এখন জুন মাস থেকেই ডেঙ্গু জ্বরের সময় শুরু হয়ে যাচ্ছে।

৯. এডিস মশা কখন কামড়ায়

ডেঙ্গু জ্বরের জন্য দায়ী এডিস মশা অন্ধকারে কামড়ায় না।  সাধারণত সকালের দিকে এবং সন্ধ্যার কিছু আগে এডিস মশা তৎপর হয়ে উঠে। এডিস মশা কখনো অন্ধকারে কামড়ায় না।

১০. পানি জমিয়ে না রাখা

অধ্যাপক আবদুল্লাহ বলছেন, ”এডিস মশা ‘ভদ্র মশা’ হিসেবে পরিচিত। এসব মশা সুন্দর-সুন্দর ঘরবাড়িতে বাস করে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এডিস মশা সাধারণত ডিম পাড়ে স্বচ্ছ পানিতে। কোথাও যাতে পানি তিন থেকে পাঁচদিনের বেশি জমা না থাকে।  এ পানি যে কোন জায়গায় জমতে পারে। বাড়ির ছাদে কিংবা বারান্দার ফুলের টবে, নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন পয়েন্টে, রাস্তার পাশে পড়ে থাকা টায়ার কিংবা অন্যান্য পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে।

এডিস মশা সম্পর্কে বিবিসি বাংলার তথ্য

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু বিষয়ক কর্মসূচির ব্যবস্থাপক এম. এম. আখতারুজ্জামান জানান ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী এডিস মশা খালি চোখে দেখে শনাক্ত করা সম্ভব।  “এই জাতীয় মশার দেহে সাদা কালো ডোরাকাটা দাগ থাকে, যে কারণে এটিকে টাইগার মশা বলা হয়।” এই জাতীয় মশা মাঝারি আকারের হয়ে থাকে এবং এর অ্যান্টেনা বা শুঙ্গটি কিছুটা লোমশ দেখতে হয়। “এডিস মশার অ্যান্টেনায় অনেকটা দাড়ির মত থাকে। পুরুষ মশার অ্যান্টেনা স্ত্রী মশার চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি লোমশ দেখতে হয়।” দেহের ডোরাকাটা দাগ এবং অ্যান্টেনা দেখে এডিস মশা চেনা সম্ভব বলে জানান মি. আখতারুজ্জামান।

এডিস মশা কি শুধু সকালে কামড়ায়?

রাতে এডিস মশা কামড়ায় না শুধুমাত্র দিনের আলো থাকাকালীন সময়েই এডিস মশা কামড়ায় বলে নিশ্চিত করেন ডা. আখতারুজ্জামান।  “সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এডিস মশা কামড়ায়।  তবে কামড়ানোর হার সবচেয়ে বেশি থাকে সূর্যোদয়ের পর দুই-তিন ঘন্টা এবং সূর্যাস্তের আগের কয়েক ঘন্টা।”

এডিস মশা একবার কামড়ালেই কী ডেঙ্গু হয়?

এডিস মশা কামড়ালে যে মানুষের ডেঙ্গুজ্বর হবেই, বিষয়টি এমন নয় বলে জানান ডা. আখতারুজ্জামান।  পরিবেশে উপস্থিত ভাইরাস এডিস মশার মধ্যে সংক্রমিত হলে সেই মশার কামড়ে ডেঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।  “এডিস মশা ভাইরাস সংক্রমিত থাকা অবস্থায় মানুষকে কামড়ালে সুস্থ মানুষের ডেঙ্গু হতে পারে।” ভাইরাসের কারণে হওয়া জ্বরে আক্রান্ত থাকা ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ালেও মশার মধ্যে ভাইরাস সংক্রমণ হওয়ার সুযোগ থাকে বলে জানান মি. আখতারুজ্জামান।  “এডিস মশার একটা বিষয় হলো, তারা সাধারণত একাধিক ব্যক্তিকে কামড়ায়।  তাই ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির শরীর থেকে এডিস মশার মধ্যে ভাইরাস সংক্রমণ হওয়ার পর ঐ মশার কামড়ে ডেঙ্গু হয়।”

নারিকেল তেল মাখলে কি আসলেই মশা কামড়ায় না?

ডেঙ্গু প্রতিরোধ গত কিছুদিন ধরে বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যমে আরেকটি বিষয় নিয়েও আলোচনা হচ্ছে – সেটি হলো পায়ে নারিকেল তেল মাখা।  নারিকেল তেল মশা তাড়ায় এবং তেল পায়ে মাখলে মশার কামড় থেকে বাঁচা সম্ভব – এই দাবির সাথে পুরোপুরি একমত প্রকাশ করেননি শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ব বিভাগের অধ্যাপক তাহমিনা আখতার।  “মশা যেহেতু চামড়া ভেদ করে রক্ত পান করে, তাই চামড়ার ওপর ঘন যেকোন ধরণের তেলই মশাকে কিছুটা প্রতিহত করতে পারে বলে আমি মনে করি।”  তবে এক্ষেত্রে নারিকেল তেলের সাথে কীটনাশক জাতীয় কোন দ্রব্য মিশিয়ে নিলে আরো বেশি কার্যকর হবে বলে মনে করেন মিজ. আখতার।  “ন্যাপথলিন বা কর্পূরের গুড়া বেশ ভাল কীটনাশক।  নারিকেল তেলের সাথে কর্পূরের গুড়া মিশালে মশা নিবারনে তা আরো বেশি কার্যকর হতে পারে।” এছাড়া কড়া গন্ধ থাকায় নারিকেল তেলের বদলে সরিষার তেলও মশা দূরে থাকতে কার্যকর হতে পারে।

ডাক্তারদের পরামর্শ:

ডেঙ্গু রোগীকে কখন হাসপাতালে নেবেন?

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আ ফ ম হেলালউদ্দিন জানিয়েছেন, ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা কামড়ানোর ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে রোগের সূচনা ঘটে।  প্রচণ্ড জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখ ব্যথা, হাড় ও পেশিতে ব্যথা হয় এ সময়।  অরুচি ও বমি বমি ভাবও হতে পারে।  এবারের ডেঙ্গুতে ত্বকে র‌্যাশ বা দানা তেমন দেখা যাচ্ছে না।  জ্বর হওয়া মাত্রই হাসপাতালে ছোটাছুটির দরকার নেই।  তবে জ্বরের প্রথম তিন-চার দিনের মধ্যে রক্তের কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট ও ডেঙ্গু এনএস১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করানো উচিত।  ডেঙ্গু পজিটিভ হলে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রথম পাঁচ-ছয় দিন বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিতে পারেন।  এ সময় প্রচুর পানি ও তরল পান করবেন, পুষ্টিকর খাবার খাবেন, বিশ্রাম নেবেন। তবে অনেক বমি হওয়া ও বমির জন্য কিছু খেতে না পারা, অস্থিরতা ও অস্বাভাবিক আচরণ, তীব্র পেট ব্যথা ইত্যাদির মতো উপসর্গ দেখা গেলে রোগীকে হাসপাতালে নিতে হতে পারে। এ ছাড়া শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী, বয়োবৃদ্ধ, ডায়াবেটিস রোগ, হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগ রয়েছে—এমন রোগীদের শুরু থেকেই হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে হতে পারে।  এবার অনেকেই দ্বিতীয় বা তৃতীয় দফায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে এর তীব্রতা বেশি।  পরে জ্বর সারতে না সারতেই অনেকে দ্রুত ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের জটিলতায় পড়ছেন।  তাই জ্বর সেরে যাওয়ার সময় সতর্ক থাকতে হবে।

ডেঙ্গুর ক্রিটিক্যাল ফেজ বা জটিল অবস্থা শুরু হয় জ্বর সেরে যাওয়ার পর।  কাজেই জ্বর কমার পরও সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকুন।  চিকিৎসকের কাছ থেকে সতর্কসংকেতগুলো ভালো করে জেনে নিন।

সতর্কসংকেতগুলো হলো:

রক্তচাপ কমে যাওয়া, হাত-পা শীতল হয়ে আসা, চিকন ঘাম, অস্থিরতা ও অসংলগ্ন আচরণ, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুস বা পেটে পানি আসা এবং শরীরের যেকোনো স্থানে অস্বাভাবিক রক্তপাত।  আরেকটি লক্ষণ হলো প্লাটিলেটের সংখ্যা এক লাখের নিচে নেমে যাওয়া ও হিমাটোক্রিটের পরিবর্তন। এ ধরনের জটিলতায় রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া উচিত। ক্রিটিক্যাল ফেজ ৩৬ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কেটে যায়।  তবে কারও কারও ক্ষেত্রে অবস্থা আরও জটিল হতে পারে।  শক সিনড্রোম হতে পারে, বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত সরবরাহ কমে মাল্টি অরগান ফেইলিউর (একাধিক অঙ্গ অকার্যকর) হতে পারে। আবার রক্তক্ষরণ, কিডনি বা হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা, যকৃতের সমস্যা দেখা দিতে পারে।  এ ক্ষেত্রে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে রোগীকে।

ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

(ডেইলী স্টার অনলাইনে ৬ আগস্ট প্রকাশিত)

ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে কী করতে হবে সে সম্পর্কে আজ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞ পরামর্শ শিরোনামে তথ্য বিবরণীতে পরামর্শগুলো ডেঙ্গু রোগীদের মেনে চলতে বলা হয়।

বাড়িতে চিকিৎসা চলাকালীন সতর্কতা:

নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে অতিসত্বর হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।

  • জ্বর কমার প্রথম দিন রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি
  • বারবার বমি/মুখে তরল খাবার খেতে না পারা
  • পেটে তীব্র ব্যথা
  • শরীর মুখ বেশি দুর্বল অথবা নিস্তেজ হয়ে পড়া/হঠাৎ করে অস্থিরতা বেড়ে যাওয়া
  • শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক কমে যাওয়া/শরীর অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে যাওয়া

বাড়িতে চিকিৎসা:

  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম (জ্বর চলাকালীন এবং জ্বরের পর এক সপ্তাহ)
  • স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল জাতীয় খাবার খাওয়া, যেমন খাবার স্যালাইন
  • গ্লুকোজ, ভাতের মাড়, বার্লি, ডাবের পানি, দুধ/হরলিকস, বাসায় তৈরি ফলের রস, স্যুপ ইত্যাদি

জ্বর থাকাকালীন চিকিৎসা, প্যারাসিটামল ট্যাবলেট:

  • পূর্ণবয়স্কদের জন্য ২টি করে প্রতি ৬/৮ ঘণ্টা পর পর
  • বাচ্চাদের জন্য বয়স ও ওজন অনুসারে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী
  • জ্বর থাকাকালীন রোগী দিনরাত সব সময় মশারির ভেতরে থাকবে

জ্বর থাকাকালীন যে ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকতে হবে:

  • ব্যথানাশক ওষুধ (এন.এস.এ.আই.ডি গ্রুপ যেমন, ডাইক্লোফেন, আইবুপ্রোফেন, ন্যাপারক্সেন, মেফেন)
  • এসপিরিন/ক্রোপিডোপ্রেল (এন্টি প্লাটিলেট গ্রুপ) হৃদরোগীদের জন্য জ্বর থাকাকালীন ও প্লাটিলেট হওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে
  • ওয়ারফারিন (এন্টিকোয়াগুলেন্ট) হৃদরোগীদের জন্য জ্বর থাকাকালীন ও প্লাটিলেট হওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে
  • অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ (বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিরেকে)
  • কুসুম গরম পানি বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি দ্বারা সারা শরীর মোছা (এই ক্ষেত্রে ঠান্ডা পানি দেওয়া)
  • বাড়ি ও এর আশপাশের এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল নিশ্চিহ্ন করা এবং মশার আবাসস্থলে স্প্রে করা

 

 

 

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × 3 =

আরও পড়ুন