ডাকসু : শিবিরের প্রার্থী হওয়া নিয়ে যা বললেন সর্ব মিত্র চাকমা

fec-image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বাধীন ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ শীর্ষক প্যানেল থেকে সদস্য পদপ্রার্থী হয়েছেন সর্ব মিত্র চাকমা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তিনি। শিবিরের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ায় অনেকেই সর্ব মিত্রের সমালোচনা করছেন। গণমাধ্যমের সামনে এই সমালোচনার জবাব দিয়েছেন তিনি।

সোমবার (১৮ আগস্ট) শিবিরের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করা হয়। এরপর গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন সর্ব মিত্র। তিনি বলেন, ডাকসু ২০২৫ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমরা একটা জোট করেছি। সে নির্বাচনী জোটের নাম আমরা দিয়েছি ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’। এখানে বিভিন্ন মতাদর্শের, বিভিন্ন সংস্কৃতির, বিভিন্ন ধারণার মাধ্যমে একত্র হয়েছি। মূলত আমরা স্পেসিফিক কয়েকটা বিষয় একমত হয়েছি, কয়েকটা বিষয়ে কাজ করতে চাই। আমরা শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করব এবং শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য যে বেসিক নিডসগুলো আছে, তাদের যে অধিকারগুলো আছে সেগুলো আদায়ে কাজ করব।

সর্ব মিত্র বলেন, ১০৪ বছর হয়ে গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। কিন্তু এখনও পর্যন্ত আমাদের সেমিনার করতে হয়, ‘কেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাই’। অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষ পার হয়েও শিক্ষার্থীদের বেসিক নিডসগুলো, আবাসন সংকট, মানসম্মত খাদ্যের ঘাটতি, অনেক অনেক অনেক প্রবলেম! রিসেন্টলি আমাদের যে স্বাস্থ্যবীমা নামে একটা প্রহসন আছে, সেই কারণে চিকিৎসার অভাবে একজন নারী শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘটেছে।

সেই জায়গা থেকে আমরা শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করব- এমন ভাবনা থেকে একত্র হয়েছি। এখন আপনারা যে কথাটা বলছেন যে, শিবিরের যে প্যানেল- বেসিক্যালি আমরা একটা জোট করেছি। জোট মানে কী? জোট মানে এখানে একটা ডাইভার্সিটি থাকবে। এখানে বিভিন্ন ধারণার বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ, বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ এখানে একত্র হবে। যদি এখানে একই ঘরানার মানুষ থাকে তাহলে সেটাকে জোট বলা যায় না। আমি একটা কথা বলব, সেটার পাল্টা আরেকটা কথা আসবে- এটাই তো জোট। কিন্তু বিষয়টা এমনভাবে দাঁড়িয়েছে যে, শিবির এখানে প্যানেল দিয়েছে। মূলত শিবির এখানে প্যানেলটা দেয়নি। আমাকে এমনভাবে ফ্রেমিংটা করা হচ্ছে- এজ ইফ আমি শিবিরের ২৯টা বই মুখস্থ করে শিবিরে যোগ দিয়েছি। এমনটা কিন্তু না। বিষয়টা হচ্ছে- আমরা একটা নির্বাচনী জোটে গেছি। জোটে যাওয়ার জন্য স্পেসিফিক যে বিষয়গুলোতে আমাদের একমত হওয়া দরকার সেই বিষয়গুলোতে আমরা একমত হয়েছি।

তার মতে, ছাত্রশিবির তার নিজস্ব মতাদর্শ ডাকসুতে এপ্লাই করবে, এমনটা না। ডাকসু তো আসলে সেরকম আদর্শ কেন্দ্রিক বিষয় না। এখানে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আমরা কাজ করি। সেই জায়গা থেকে আপনারা যদি ধরেন, শিবির এখানে তার নিজস্ব মতাদর্শ বাস্তবায়নের জন্য প্যানেল দিয়েছে, তাহলে এটা একদমই ভুল। কারণ আপনারা জানেন কিনা আমি জানি না, গত ১০ দিন আগেও আমি শিবিরের সমালোচনা করেছি। আমি একদম স্পেসিফিকভাবে বলি, শিবির যে পানি ফিল্টার দিয়েছে বিভিন্ন হলে, আমি বলেছি যে, এই কাজটা প্রশাসনের। এটা শিবির কিংবা অন্য কোনো ছাত্র সংগঠনের কাজ না। তারা বড়জোর প্রশাসনকে জানাতে পারে। লজিক্যাল যে ক্রিটিকগুলো সেগুলো আমি বলছি। বলেছি, কালকেও আমি বলব, পরশুও বলবো। সুতরাং আমি শিবিরে জয়েন করেছি, এই প্রোপাগান্ডা ছড়ানোটা আমার জন্য খুব বেশি দুঃখের। আমরা একটা নির্বাচনী জোট করেছি এবং সেই নির্বাচনী জোটের মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীদের যে অধিকার সেটা আদায় করব এটা আমাদের প্রত্যাশা।

অনেকে সমালোচনা করছেন, চাকমা সম্প্রদায়ের মানুষ হয়ে শিবিরের সঙ্গে জোট করেছেন। এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি একজন চাকমা সম্প্রদায়ের মানুষ কিন্তু আমি চাকমা সম্প্রদায়ের জিনিসটা ওইভাবে হাইলাইট করছি না। আমি তো আসলে এখানে আর ১০ জন স্টুডেন্টের মধ্যে একজন স্টুডেন্ট। ভিন্ন মতাদর্শের একটা মানুষ কিছু ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করবে সেই জিনিসটা তারা মেনে নিতে পারছে না। সেই ব্যর্থতা তো আমার না, সেই ব্যর্থতা তাদের।

ছাত্রশিবিরের যে সকল নেতৃবৃন্দের আমার কথা হয়েছিল…, আমি কিন্তু শিবের প্যানেলে যাইনি। প্রথমে একথা আমি একদম ক্লিয়ার করে দিয়েছি। এখনে আমার দাবি দেওয়া বলতে যে জিনিসটা- আসলে এখানে ইকুইটির বেসিসে, আমরা যখন একটা জোটে যাব- আমি যদি সংখ্যায় একজন হই এবং তাদের সংখ্যাটা যদি ১০ জন হয় সেক্ষেত্রেও আমি মনে করি, এখানে সমান সমান একটা জিনিস থাকবে। সেই জায়গা থেকে আমি কতটা ফ্রিডম পাবো, আমি কতটা কথা বলতে পারবো সেই জিনিসটা আমি তাদের থেকে আশা করি অনুমতি নেয়া লাগবে না। আমি অতীতেও আদিবাসী সংখ্যালঘু থেকে শুরু করে নারীদের অধিকার- সকল বিষয়ে সোচ্চার ছিলাম এবং এখন পর্যন্ত আছি।

এর আগে প্রার্থী ঘোষণার পর নিজের ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন সর্ব মিত্র চাকমা। সেখানে তিনি বলেন,
স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার চোখে একটি রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র, যেখানে অর্ধ লক্ষের অধিক শিক্ষার্থী স্রেফ কোনো একভাবে দিনযাপন করে। না আছে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ, পুরো ক্যাম্পাস হন্যে হয়ে খুঁজেও একবেলা মানসম্মত-স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পাওয়া দুষ্কর, রয়েছে আবাসন সংকট, নেই গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত উপকরণাদি, চলছে স্বাস্থ্য বিমার নামে প্রহসন, অতঃপর চিকিৎসার অভাবে শিক্ষার্থীর মৃত্যু ইত্যাদি। পদে পদে অবহেলা-বঞ্চনা আর একরাশ হতাশা।

কিন্তু, এত শত অবহেলায় টিকে থাকা এই মানুষগুলোর মধ্যে আছে এক বিশেষ লুকায়িত শক্তি, যা রাষ্ট্রযন্ত্রকে সদা উদ্বিগ্ন রাখে। এই মানুষগুলো যে-কোনো সময় রাষ্ট্রের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। তার বড়ো এবং ঘনিষ্ঠ উদাহরণ হলো জুলাই গণ অভ্যুত্থান। সেই শঙ্কা থেকে এই মানুষগুলোকে দমিয়ে রাখার যত আয়োজন, তা রাষ্ট্রযন্ত্র করে। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫৪ বছরে ডাকসু অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র ৮ বার, যেখানে নির্বাচন হবার কথা ছিল প্রতি বছর।
আমি সর্ব মিত্র, সমাজে প্রচলিত তথাকথিত ‘নেতা’ হয়ে সুপেরিয়রিটি চর্চার প্রয়াস বা বাসনা আমার নেই। এখানে যারা আসেন, সকলে নিঃসন্দেহে দেশসেরা মেধাবী, লক্ষ লক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে লড়াই শেষে বিজয় ছিনিয়ে এ জায়গায় আসেন তারা, তাদের ওপর কর্তৃত্ব দেখানোর দুঃসাহস আমি ঘুণাক্ষরেও করি না।

জ্ঞান হবার পর থেকে একজন শিক্ষার্থীর মৌলিক অধিকার, নারীর অধিকার, আদিবাসী-সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে আমার কণ্ঠ সর্বদা সোচ্চার ছিল এবং আমৃত্যু সকল অন্যায়-অবিচার-অনিয়ম-দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান অবিচল থাকবে। আমার বিশ্বাস, আমার স্বাতন্ত্র্য, সৎসাহসের সাথে আপনাদের ভালোবাসা আমাকে উজ্জীবিত রাখবে।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ডাকসু নির্বাচন
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন