কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু


বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি ফেরাতে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে হোটেল বে-ওয়াচ মিলনায়তনে আজ রোববার থেকে শুরু হচ্ছে ৩ দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট জোরপূর্বক বাস্ত্যুচ্যুত মিয়ানমারের এই নাগরিকরা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। ২৪-২৬ আগস্ট-তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে ৪০টি দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা।
সোমবার সম্মেলনে যোগ দিয়ে ভাষণ দেবেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সমাপনী দিনে ২৬ আগস্টেও প্রধান উপদেষ্টা সেখানে অবস্থান করে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান ও তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিয়ে বিভিন্ন সেশনে অংশ নিয়ে বক্তব্য রাখবেন বলে জানা যায়।
আজ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে ৩ দিনের এই সম্মেলন শুরু হয়েছে। চলবে ২৬-আগস্ট মঙ্গলবার পর্যন্ত। মূলত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করে তাদের কথা, দাবি দাওয়া, প্রত্যাবাসন, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি, রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বিচার ও রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের উপায় বের করা।
সম্মেলনের প্রধান উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে-২০১৭ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীরা যে নির্মম গণহত্যার মুখোমুখি হয়েছে এবং একপ্রকার বাধ্য হয়ে এদেশে চলে আসতে হয়েছে, তা তারা আন্তর্জাতিক মহলে গিয়ে সশরীরে বলতে পারাটা বেশ কষ্টকর। এই সম্মেলনের মাধ্যমে সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের প্রতিনিধিদেরকে রোহিঙ্গা প্রতিনিধি তাদের কথা, দাবি দাওয়াগুলো, নির্মম অত্যাচার নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ও মানবিক সহায়তার দিকটা গতিশীল করার প্রচেষ্টাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, “অন্তর্বর্তী সরকার রোহিঙ্গা ইস্যু খুব ‘সিরিয়াসলি’ দেখছেন। অনেক দেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে আমরা আলাপ আলোচনা করছি। রোহিঙ্গা সংকট যেন আন্তর্জাতিকভাবে একটা প্রধান আলোচনার বিষয় হয়, সেজন্য তিন-তিনটা বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলন করার পরিকল্পনা নিয়েছি। এর অংশ হিসেবেই তিনদিনব্যাপী সম্মেলন।”
শফিকুল আলম বলেন, “সম্মেলনের উদ্দেশ্য হচ্ছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি, রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বিচার ও রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের উপায় বের করা। সম্মেলনের প্রধান বিষয় হচ্ছে রোহিঙ্গারা যে গণহত্যার মুখোমুখি হয়েছে, সেটা আন্তর্জাতিক মহলে গিয়ে তাদের বলতে পারাটা বেশ কষ্টকর। সেজন্য কক্সবাজারে ৪০টির মত দেশের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। তাদের সামনে রোহিঙ্গারা তাদের কষ্টের কথা তুলে ধরবেন।জাতিসংঘের অনেক সংস্থা, বিদেশি সংস্থার প্রতিনিধিরা থাকবেন। তাদের কাছে রোহিঙ্গারা তাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরতে পারবেন।”
প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, মিয়ানমারে জাতিসংঘের স্পেশাল রেপোর্টিয়ার থমাস এনড্রোস, রোহিঙ্গা বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ এমপি ইমরান, জাতিসংঘে মালয়েশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি এবং ঢাকার অন্তত ১০ জন রাষ্ট্রদূত সম্মেলনে থাকবেন।
প্রেস সচিব বলেন, “আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে সবচেয়ে বড় সম্মেলনটি হবে। সেখানে ১৭০টা দেশ অংশ নেবে বলে আশা করছি। এরপর কাতারের রাজধানী দোহায় আরেকটা সম্মেলনের আশা করছি।”
গত রমজানে (১৪ মার্চ) রোহিঙ্গাদের এক সমাবেশে ড. ইউনূস বলেছিলেন, এই ঈদ না হোক, আগামী ঈদে রোহিঙ্গারা নিজেদের দেশে ঈদ করতে পারবেন।
-এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও যে কোনো মূল্যে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফেরাতে তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ। এরই ধারাবাহিকতায়, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের আগে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ৩ দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন বিশেষ গুরুত্ব বলেন হন করে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাখাইনের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষের পথে। ফলে রোহিঙ্গাদের নিয়ে তোড়জোড় থাকলেও এই উদ্যোগ কতটা আলোর মুখ দেখবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনকালে তার প্রত্যাশার কথায় স্বস্তি আসে অনেকের মাঝে। রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলেন, ‘আল্লাহর কাছে দোয়া করি, সাম্মার বার যেন তোমরা নিজের বাড়িতে ঈদ করতে পারো।’
সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল ও বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের মানুষের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে ড. ইউনূস আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এজন্য তিনি নির্বাচনের সমান গুরুত্ব দিয়ে যে কোনো মূল্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করতে চান। এ উদ্দেশ্যেই কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে বলে জানা ধারণা করা যায়।
কক্সবাজারে অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলন সম্পর্কে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য বর্তমান সরকার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকার আশাবাদী, শিগগিরই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে সক্ষম হবে। মূলত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করতেই কক্সবাজারে তিন দিনব্যাপী এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, সম্মেলনের জন্য সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে।
এ বিষয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে এ দেশ থেকে রোহিঙ্গাদের বোঝা নামিয়ে দিতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ এককভাবে চাইলে প্রত্যাবাসন শুরু করতে পারবে না। তবে প্রধান উপদেষ্টা গত বছর জাতিসংঘ মহাসচিবসহ রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতারে অংশ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন পরের ঈদে তারা ঘরে বা দেশে গিয়ে ঈদ করবেন।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্টের মধ্যে দেড় বছরে নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা। এর ফলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মোট রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত সাড়ে ১৫ লাখ। রোহিঙ্গা চাপের সঙ্গে নতুন করে আরও সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ।
সম্মেলন উপলক্ষ্যে কক্সবাজারে নিছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনীকে দিয়ে কক্সবাজারকে নিরাপত্তা চাদরে আবৃত করা হয়েছে।

















