মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরে জেটি টার্মিনাল নির্মাণ কাজ শুরু

দীর্ঘ প্রতীক্ষা, পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির পর অবশেষে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের জেটি ও টার্মিনাল নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের এক বছর পর রবিবার (৩ মে) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয় বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে এই বন্দরের মাধ্যমে।
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)-এর অর্থায়নে প্রায় ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির প্যাকেজ-১ বাস্তবায়ন করছে জাপানের দুই শীর্ষ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান পেন্টা ওশান কনস্ট্রাকশন এবং টোয়া কর্পোরেশন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পুরো মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা, যা দেশের অন্যতম বড় অবকাঠামো বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রকল্পের শুরুতেই বড় পরিসরে ড্রেজিং কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। জাপান থেকে আনা আধুনিক ও বিশেষায়িত ড্রেজারের মাধ্যমে প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুটের বেশি মাটি ও বালি উত্তোলন করা হবে। এসব মাটি দিয়ে বন্দরের জেটি এলাকা, টার্মিনাল এবং ব্যাকইয়ার্ড ফ্যাসিলিটির জন্য ভূমি উন্নয়ন ও ভরাট কাজ সম্পন্ন করা হবে।
প্যাকেজ-১ এর আওতায় নির্মাণ করা হবে-৪৬০ মিটার দীর্ঘ একটি কন্টেনার জেটি। ৩০০ মিটার দীর্ঘ একটি মাল্টিপারপাস জেটি। আধুনিক টার্মিনাল সুবিধা। ব্যাকইয়ার্ড ও লজিস্টিক সাপোর্ট। চার বছরের মধ্যে এই অবকাঠামোগুলো নির্মাণ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী-ধলঘাটা ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার ৩০ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত হচ্ছে এই গভীর সমুদ্রবন্দর। ভৌগোলিকভাবে এটি এমন স্থানে অবস্থিত, যেখানে গভীর পানির সুবিধা থাকায় বড় ড্রাফটের জাহাজ সরাসরি ভেড়াতে পারবে-যা দেশের বিদ্যমান বন্দরের জন্য একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৯ সালের মধ্যে বছরে প্রায় ১১ লাখ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে এই সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ২৬ লাখ টিইইউএস। এই বন্দর চালু হলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে গতি বাড়বে, ট্রানশিপমেন্ট নির্ভরতা কমবে এবং সরাসরি বড় জাহাজে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে। ফলে পরিবহন খরচ ও সময় দুটোই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৯ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হবে এবং ২০৩০ সাল থেকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করবে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বন্দর চালু হলে শুধু কক্সবাজার বা চট্টগ্রাম নয়-পুরো দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে, পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্যেও বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।

















