রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই কর্ণফুলী কলেজে শিক্ষক নিয়োগে নানা অনিয়মের অভিযোগ

image_47007

নিজস্ব প্রতিনিধি:

রাঙামাটি পার্বত্য জেলার ঐতিহ্যবাহী কাপ্তাই কর্ণফুলী কলেজে উপাধ্যক্ষ ও প্রভাষক নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম দুর্ণীতির অভিযোগ উঠেছে।

 

আগে থেকে নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষামন্ত্রনালয়ের নিয়োগ বিধি উপেক্ষা করার পাশাপাশি এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কলেজ গভর্নিং বডির সিংহভাগ সদস্যের মতামতও উপেক্ষা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। নানা অনিয়মের মাধ্যমে গত ৫ এপ্রিল নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহনের পর গত ১৭ এপ্রিল ও ২৭ এপ্রিল দুই দফায় নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল ঘোষনা করে ২৭ এপ্রিলই নিয়োগ অনুমোদন করা হয়। উপাধ্যক্ষ পদে একই কলেজের একজন প্রভাষককে ২৭ এপ্রিল তারিখে নিয়োগ অনুমোদনের পর ২৮ এপ্রিল উক্ত প্রভাষককে প্রভাষক পদ থেকে পদত্যাগ করিয়ে ২৯ এপ্রিল তারিখে উপাধ্যক্ষ পদে যোগদান করানো হয়।

সরেজমিন অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কর্ণফুলী কলেজে উপাধ্যক্ষের সৃষ্ট পদে এবং কয়েকজন প্রভাষকের শুণ্যপদে নিয়োগের জন্য গত ১ নভেম্বর’ ১৩ তারিখে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যেই দেশের বিভিন্নস্থান থেকে উপাধ্যক্ষ ও প্রভাষক পদে ১০৪ জন প্রার্থী আবেদন করেন। এর মধ্যে শুধু উপাধ্যক্ষ পদেই আবেদন করেন ২৪ জন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ৩ মাসের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নিয়ম থাকলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় প্রায় ৫ মাস পর।

গত ৫ এপ্রিল উক্ত নিয়োগের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার তারিখ দিয়ে ইন্টারভিউ কার্ড প্রেরণ করেন কলেজের অধ্যক্ষ। আবেদনকারী প্রার্থীরা অভিযোগ করেন, অধ্যক্ষ নিজ পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে এবং পরিকল্পিত উপায়ে বিপুল সংখ্যক প্রার্থীকে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহন থেকে বিরত রাখতে মাত্র ৫ দিন সময় হাতে রেখে প্রার্থীদের ঠিকানায় ইন্টারভিউ কার্ড ডাকযোগে প্রেরণ করেন। ৫ এপ্রিল নিয়োগ পরীক্ষার দিন নির্ধারিত থাকলেও ২৭ এপ্রিল বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রার্থীদের ঠিকানায় ইন্টারভিউ কার্ড পোস্ট করা হয়। বিকেলে পোস্ট করার কারনে ঐদিনের ডাক আগেই চলে যায়, এর পরবর্তী শুক্র ও শনিবার সরকারী বন্ধ থাকায় ইন্টারভিউ কার্ডগুলি ডাকঘরেই পড়ে থাকে। পরবর্তী রোববারে কাপ্তাই থেকে ইন্টারভিউ কার্ডের ডাক প্রেরিত হলেও সংক্ষিপ্ত সময়ে সিংহভাগ প্রার্থী ইন্টারভিউ কার্ড না পাওয়ায় নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহন করতে পারেন নি।

উপধ্যক্ষ পদে প্রার্থী কর্ণফুলী কলেজের দর্শন বিভাগের প্রভাষক ওমর খৈয়াম জানান, ‘আমার বাসা কলেজ থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দুরে চট্টগ্রামের লালখান বাজার এলাকায়। কিন্তু যথানিয়মে আবেদন করেও রহস্যজনক কারনে আমি ডাক মারফত ইন্টারভিউ কার্ড পাইনি। আমি একই কলেজের শিক্ষক হওয়ায় বিভিন্ন সূত্রে নিয়োগ পরীক্ষার তারিখের কথা জানতে পেরে কলেজ থেকে ডুপ্লিকেট ইন্টারভিউ কার্ড সংগ্রহ করে আমি নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করি। কলেজের ইসলামী শিক্ষা বিভাগের প্রভাষক কায়সারুল ইসলাম জানান, উপাধ্যক্ষ ও প্রভাষক পদে নিয়োগ কমিটি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত ও সভার কার্যবিবরনী অনুযায়ী নিয়োগ কমিটির ৪ নং সদস্য ছিলেন গভর্নিং বডির সদস্য সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মফিজুল হক। অধ্যক্ষের পছন্দের প্রার্থীর বিরোধিতা করতে পারেন এবং নিয়োগ পরীক্ষার দিন স্ব-শরীরে উপস্থিত থাকতে পারেন-এমন আশঙ্কায় নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহনের পূর্ব মুহুর্তে গভর্ণিং বডির সিদ্ধান্ত এবং রেজুলেশন ছাড়াই মফিজুল হককে বাদ দিয়ে কর্ণফুলী পেপার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নিয়োগ কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তুর্ভূক্ত করেন কলেজের অধ্যক্ষ এএইচএম বেলাল চৌধুরী।

কলেজের সিনিয়র সহকারী অধ্যাপক বিপুল কান্তি বড়ুয়া জানান, শুরু থেকে কর্ণফুলী কলেজের উপাধ্যক্ষ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মের আশ্রয় গ্রহন করেন কলেজে অধ্যক্ষ। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম দফা উপাধ্যক্ষ্য পদে নিয়োগে আবেদন আহ্বান করা হলেও কলেজের দুই জন সিনিয়র শিক্ষককে নিয়োগ আবেদনের বাইরে রাখতে সেই নিয়োগ কার্যক্রম নানা অজুহাতে বাতিল করেন কলেজ অধ্যক্ষ। দ্বিতীয় দফায় উপাধ্যক্ষ ও প্রভাষক পদে নিয়োগ কার্যক্রমে অনিয়ম দুর্ণীতির বিষয়টি ওপেন সিক্রেট এবং চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

উপাধ্যক্ষ পদের প্রার্থী মোঃ আবু তালেব জানান, ৫ এপ্রিল মুল নিয়োগ পরীক্ষার দিন রেজুলেশন ছাড়া নিয়োগ কমিটিতে অন্তর্ভুক কর্ণফুলী পেপার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক উপস্থিত ছিলেন না এবং প্রার্থীদের কাছ থেকে তিনি কোন মৌখিক পরীক্ষাও গ্রহন করেননি। কিন্ত পরীক্ষার ফলাফল শীটে অনুপস্থিত এই নিয়োগ কমিটির সদস্যের নামে নম্বর অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ উঠেছে। অপরদিকে নিয়োগ কমিটির প্রধান এবং কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকও নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহনের সময় উপস্থিত ছিলেন না। তার পক্ষে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রতিনিধিত্ব করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

আবু তালেব আরও জানান, গভর্নিং বডি কর্তৃক অনুমোদিত ৪ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ২ জন সদস্য পরীক্ষার সময় উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া উপস্থিত সদস্যরা দায়সারাভাবে প্রার্থীদের কাছ থেকে মৌখিক পরীক্ষা গ্রহন করেন। মৌখিক পরীক্ষার সময় আমার অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্রসমূহ দেখার অনুরোধ করলেও তারা সনদপত্র দেখারও আগ্রহও দেখান নি। এতে আমাদের কাছে অনুমিত হয়েছে পূর্ব থেকে নির্ধারিত হয়ে গেছে কাকে নিয়োগ করা হবে তাই এমন দায়সারা পরীক্ষা গ্রহন করা হয়েছে।

কলেজের শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবিএম সায়েফ উল্লাহ বলেন, কলেজের শুণ্যপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৩ জন প্রার্থীর মধ্যে থেকে পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথমস্থান প্রাপ্ত প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়ার নিময় রয়েছে শিক্ষা অধিদপ্তরের। কিন্তু পৌরনীতি সুশাসন এবং ইতিহাস বিভাগের ২টি প্রভাষক পদে প্রার্থী ছিলেন মাত্র ২ জন করে। এই দুইজন প্রার্থী থেকে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যদিও বেসরকারী কলেজের শিক্ষক নিয়োগ বিধি অনুযায়ী ৩ জন প্রার্থীর কম হলে ওই পদের পরীক্ষা বাতিল করার নিয়ম রয়েছে।

এবিএম সায়েফ উল্লাহ বলেন ৫ এপ্রিল পরীক্ষা নিয়ে একই দিন ফলাফল ঘোষনার নিয়ম থাকলেও রহস্যজনক কারনে প্রভাষক পদের ফলাফল ঘোষনা করা হয় ১২ দিন পর এবং উপাধ্যক্ষ পদের ফলাফল ঘোষনা করা হয় ২৫ দিন পর। সর্বশেষ ২৭ এপ্রিল উপাধ্যক্ষ পদের ফলাফল ঘোষনা করে ঐ দিনেই গভর্নিং বডির অধিকাংশ সদস্যের আপত্তি সত্ত্বেও উপাধ্যক্ষ পদের নিয়োগ অনুমোদন করেন কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি।

কলেজের শিক্ষক প্রতিনিধি দ্বিপান্বিতা বড়ুয়া বলেন, গভর্নিং বডির অধিকাংশ সদস্যই এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম দুর্ণীতি হয়েছে বলে অভিযোগ উত্থাপন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। কিন্তু কারো আপত্তি আমলে না নিয়ে নিয়োগ অনুমোদন করা হয়েছে। সভাপতি একক সিদ্ধান্তে নিয়োগ অনুমোদন করায়, শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের মনোনীত প্রতিনিধি সাবেক কাপ্তাই উপজেলা চেয়ারম্যান অংশুছাইন চৌধুরী আপত্তি তুলেন। এক পর্যায়ে তিনি গভর্নিং বডির সভাপতি পরিবর্তনের প্রস্তাব করলে তা সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন করেন গভর্নিং বডির সদস্যরা।

কলেজের উপাধ্যক্ষ এবং প্রভাষক নিয়োগে অনিয়ম দুর্ণীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে কলেজের অধ্যক্ষ এএইচএম বেলাল চৌধুরীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, যা কিছু করা হয়েছে কলেজের স্বার্থেই করা হয়েছে। গভর্নিং বডির অনুমোদন ছাড়া পরীক্ষা কমিটির সদস্য পরিবর্তন এবং পরিবর্তিত সদস্য উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও তার নম্বর প্রদান প্রসঙ্গে বেলাল চৌধুরী বলেন, এখন ডিজিটাল সময় কেউ স্ব-শরীরে উপস্থিত না থাকলেও ডিজিটাল পদ্ধতিতে তিনি পরীক্ষা গ্রহন বা নম্বর প্রদান করতে পারেন।

নিয়োগ অনুমোদনে গভর্নিং বডির সদস্যদের আপত্তির বিষয়টি স্বীকার করে অধ্যক্ষ বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের কথা বলে কতিপয় সদস্য নিয়োগ অনুমোদনে আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে অনিয়মের প্রমাণ দিতে না পারায় তাদের প্রস্তাব গ্রহন করা হয়নি। ৩ জন প্রার্থীর প্যানেল পূর্ণ না হওয়া সত্ত্বেও পরীক্ষা গ্রহন বিষয়ে অধ্যক্ষ জানান, পাহাড়ী এলাকার কলেজের ক্ষেত্রে এই শর্ত মানা বাধ্যতামূলক নয়। তিনি অধ্যক্ষ ও প্রভাষক পদে নিয়োগে কোন অনিয়ম হয়নি বলে দাবী করেন।

ঘটনাপ্রবাহ: অনিয়ম, অভিযোগ, কাপ্তাই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 + 6 =

আরও পড়ুন