শুধু উন্নয়ন নয়, টেকসই উন্নয়ন চায় মহেশখালীর জনগণ

fec-image

টেকসই উন্নয়ন বলতে এমন উন্নয়ন কৌশল ও কর্মসূচির কথা বলা হচ্ছে যা পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না এবং ক্ষতিগ্রস্ত করলেও যতটুকু সম্ভব কম করবে যার ফলে এমন পরিবেশ বজায় থাকবে, যা শুধু এই প্রজন্মের জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের জন্যও থাকবে নিরাপদ ও অনুকূল। পরিবেশসম্মত বা পরিবেশবান্ধব এই উন্নয়নকেই বলা হয় টেকসই উন্নয়ন বা Sustainable development. জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (UNEP) গভর্নিং কাউন্সিলের ১৯৮৯ সালের ১৫/১২ সিদ্ধান্তে টেকসই উন্নয়নের ধারণাকে নিম্নোক্তভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে,

Sustainable development is development that meets the needs of the present without compromising the ability of future generations to meet their own needs. It contains within it two key concepts:

  • The concept of ‘needs’, in particular, the essential needs of the world’s poor, to which overriding priority should be given; and
  • The idea of limitations imposed by the state of technology and social organization on the environment’s ability to meet present and future needs.

— World Commission on Environment and Development, Our Common Future (1987)

সাম্প্রতিককালে বিশেষ করে বিগত এক দশকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পরিবেশ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে এবং এখনও তা একই ব্যাপ্তি ও গতিতে অব্যাহত আছে।

‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি)’ বা টেকসই উন্নয়ন বলতে ঐ ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডকে বোঝায়, যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাও নিশ্চিত হয় আবার প্রকৃতি এবং বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেমেও কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ে না। ভিন্নভাবে বললে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা হলো, ভবিষ্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংক্রান্ত একগুচ্ছ লক্ষ্যমাত্রা। টেকসই উন্নয়নের ব্যাপারটা প্রথম আলোচনায় আসে ১৯৮৭ সালে, ব্রুন্টল্যান্ড কমিশন এর রিপোর্টে। ২০০০ সালে শুরু হওয়া ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল’ বা এমডিজি অর্জনের সময় শেষ হয় ২০১৫ সালে। এরপর জাতিসংঘ ঘোষণা করে ১৫ বছর মেয়াদি ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল’ বা এসডিজি। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ২০১৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদে এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য পূরণ করতে হবে। ২০১৫ সালে জাতিসংঘ দারিদ্র্য বিমোচন, বিশ্ব রক্ষা এবং একটি নতুন টেকসই উন্নয়নের এজেন্ডা হিসেবে সকলের জন্য সমৃদ্ধি নিশ্চিতে ১৭টি লক্ষ্য ও ১৬৯টি সহায়ক লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করে। এসডিজির লক্ষ্যগুলো প্রণয়ন ও প্রচার করেছে জাতিসংঘ, যা নির্ধারণ করা হয় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘ সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সামিট’ নামক সম্মেলনে।

২০১৫ সালের আগস্ট মাসে ১৯৩টি দেশ ১৭ লক্ষ্যমাত্রা বিষয়ে একমত হয়েছে, যার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল: (১) ক্ষুধা মুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টির লক্ষ্য অর্জন ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা চালু। (২) সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা… সবার জন্য পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের সহজপ্রাপ্যতা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। (৩) জলবায়ু বিষয়ে পদক্ষেপ… জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবেলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা। (৪) টেকসই মহাসাগর… টেকসই উন্নয়নের জন্য মহাসাগর, সাগর ও সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও সেগুলোর টেকসই ব্যবহার করা। (৫) ভূমির টেকসই ব্যবহার… পৃথিবীর ইকোসিস্টেমের সুরক্ষা, পুনর্বহাল ও টেকসই ব্যবহার করা, টেকসইভাবে বন ব্যবস্থাপনা, মরুকরণ রোধ, ভূমিক্ষয় রোধ ও বন্ধ করা এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি রোধ করা।

২০১৮ সালের ৪-৬ জুলাই বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো টেকসই উন্নয়নে অভীষ্ট বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পর্যালোচনা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট-এর সহযোগিতায় এই সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে দুই হাজার প্রতিনিধি যোগদান করেন। এই সম্মেলনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো— এসডিজি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভবিষ্যত্ করণীয় কী— তা সকলকে অবগত করা। সম্মেলনে যে চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা হয় তার মধ্যে দুটি হলো- (১) জলবায়ু পরিবর্তনে বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় আমরা যথেষ্ট সক্ষমতা অর্জন করলেও এটি আমাদের কৃষি খাত ও খাদ্য নিরাপত্তার উপর ক্রমাগত আঘাত হানবে। (২) পরিবেশ বিপর্যয় রোধ, জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় আমাদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা আরো জোরদার করতে হবে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মহেশখালীর উন্নয়ন:

কক্সবাজারের উত্তর-পশ্চিমে চকরিয়া উপজেলা পেরিয়ে মহেশখালী দ্বীপ। দ্বীপের তিন দিকে বঙ্গোপসাগর, একদিকে কোহেলিয়া নদী। নদীর ওপর বদরখালী সেতু। সেতুটি দ্বীপকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে বেঁধেছে। সরকারের বিদ্যুৎবিষয়ক মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪১ সাল নাগাদ সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে মহেশখালীতে—কয়লাভিত্তিক ১২টি, বায়ুভিত্তিক ১টি ও সৌরশক্তির ২টি। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি স্থল টার্মিনাল হবে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি এখানেই তৈরি করছে দেশের সবচেয়ে বড় তেলের ডিপো। পেট্রোবাংলার একটি প্রতিষ্ঠান (জিটিসিএল) নির্মাণ করছে মহেশখালী ও আনোয়ারা গ্যাস সঞ্চালন লাইন।

দ্বীপটির এক-দশমাংশের কিছু বেশি এলাকাজুড়ে বেজা পাঁচটি অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ করছে। তিনটির জন্য জমি অধিগ্রহণ চলছে। মূলত ভারী শিল্পকারখানা হবে। এসব কারখানার কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের থাকার জন্য হবে আবাসিক এলাকা। কিন্তু মহেশখালীর জনগণ এই সব উন্নয়নের মহাযজ্ঞে টেকসই উন্নয়নের শর্তগুলো কতটুকু মানা হচ্ছে তা নিয়ে সন্দিহান। কারণ আদৌ সরকার এ সব বিষয়কে প্রাধান্য দিচ্ছে কিনা: (১) জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবেলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা। (২) টেকসই মহাসাগর… টেকসই উন্নয়নের জন্য মহাসাগর, সাগর ও সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও সেগুলোর টেকসই ব্যবহার করা। (৩) ভূমির টেকসই ব্যবহার… পৃথিবীর ইকোসিস্টেমের সুরক্ষা, পুনর্বহাল ও টেকসই ব্যবহার করা, টেকসইভাবে বন ব্যবস্থাপনা, মরুকরণ রোধ, ভূমিক্ষয় রোধ ও বন্ধ করা এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি রোধ করা ইত্যাদি।

মহেশখালীর এই সব উন্নয়নের মহাযজ্ঞ নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। এর মধ্যে দেশের একটি জাতীয় দৈনিককে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী বলেছেন, বড় অবকাঠামো তৈরি করতে গেলে পরিবেশের কিছুটা ক্ষতি হবে। তবে উন্নয়নও জরুরি। প্রতিটি প্রকল্পকে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করে কাজে নামতে হবে। পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করে কাজ করতে হবে।

এছাড়াও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে তথ্য অধিকার আইনে বিপিসির প্রকল্পটির ইআইএর কপি চেয়েছিল। মন্ত্রণালয় বেলার চাহিদামতো অন্যান্য কাগজপত্র ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের কপি দিয়েছে। কিন্তু সম্ভাব্য অপব্যবহারের ঝুঁকির কথা বলে ইআইএ প্রতিবেদনের কপি দেয়নি।

আরেকটি বিষয় হলো দেশের একমাত্র পাহাড়ী দ্বীপে এত উন্নয়ন প্রকল্প এর পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষার সাথে সংগতির্পূণ হওয়ার কথা নয়। তাই মহেশখালীর গৌরব ড. সলিম উল্লাহ খান সহ অন্যান্য বুদ্ধিজীবী ও পরিবশেবাদীরা সংশয় প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। আমরা মহেশখালীর জনগণ মহেশখালীতে টেকসই উন্নয়ন চাই, কিন্তু উন্নয়নের নামে যেন মহেশখালীর মাটি ও মানুষের জন্য ক্ষতিকর কোনো কর্মকাণ্ড না হয়। কারণ উন্নয়ন ও টেকসই উন্নয়ন এক নয়।

লেখক: আইনজীবী, ঢাকা জজ কোর্ট (মহেশখালী উপজলোর ছোট মহেশখালীর অধিবাসী)।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen + 11 =

আরও পড়ুন