পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে একটি মর্মন্তুদ কাহিনী

বৃদ্ধের অপেক্ষা

fec-image

ত্রিশ-চল্লিশটার মত বাচ্চার লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরেছিলো স্কুল ঘরটায় আর তার বারান্দার মেঝেতে। সবগুলোর জন্য খোঁড়া হলো একটি কবর।এর মধ্যে চারটে বাচ্চা, বয়স পাঁচ কি সাত মাস হবে, মায়ের রক্তের সাথে জমাট বেঁধে ছিলো প্রাণহীন পতুলের মত।

সময়টা ১৯৮১ সাল। ভোর আনুমানিক চারটা। কিছুটা আবছা আলো ফুটে উঠেছে। শীতকাল বলে সূর্য একটু দেরিতেই দেখা যায়, তার উপর পাহাড়ি এলাকা কুয়াশা একটু বেশী। মান্নানের বয়স সাত কি আট। ওদের বাড়িটা পাহাড়ের একেবারে ঢাল ঘেঁষে। তাদের বাড়ির গায়ে গা ঘেঁষেই আরো সাত আটখানা বাড়ি। বাড়িগুলোর অবস্থানগত দুরত্ব দেখে মনে হয় জমির অপর্যাপ্ততা তাদের এই ঘিঞ্জি জড়সড়ভাবে বসবাস করতে বাধ্য করেছে। ঘন জঙ্গলাকীর্ণ এলাকা বিস্তীর্ণ মাঠ আর জলাভূমিও নেহাৎ কম নয়।

বস্তুত ভয় শঙ্কা আর আতঙ্কই তাদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসবাস করাচ্ছে। চিকন বাশেঁর তৈরি এক প্রকার খেলনা যেটার ভেতর বাবলা নামের এক গাছের ছোট দানা সদৃশ ফল গুলিকে বুলেট হিসেবে পুরে মান্নান আর তার বন্ধুরা গোলাগুলি করত। আওয়াজটা একেবারে বন্দুকের মতই । কখনো আবার এটা থেকে ধোঁয়াও বেরুতো।

সেদিন এই খেলনাটার আওয়াজ কানে আসতে সে ঘুম থেকে উঠে যায়। খালি গায়ে পশ্চিম দিকের ছোট পাড়াটার দিকে পা দিতেই তার কাকা তাকে হাতে ধরে অনেকটা টানা হেঁচড়া করে ঘরে নিয়ে যায়।

প্রায় আধাঘণ্টা একটানা ব্রাশফায়ার চললো। কোনটা প্রকৃত গুলির আওয়াজ তা বোঝার মত অবস্থা মান্নানের তখনো হয়নি।

ভবানী চরণ স্কুলে প্রায় পঞ্চাশটি নদীতে সর্বস্ব হারানো আশ্রয়হীন পরিবারকে রাখা হয়েছিল।

গত পরশুদিন তাদের ছোট একটা দল এসে বিভিন্ন বাড়ি থেকে চাল আর খাবার লবণ নিয়ে গিয়েছিল। আজ ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে গগণ বিদারী আর্তনাদ আর ব্রাশ ফায়ারের মুহুর্মুহু আওয়াজে সমস্ত স্কুল ঘরটি একটি নিরব নিস্তব্ধ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়।

শ’ তিনেক অভাগা মানুষের মধ্যে কেও কেও হাতে পায়ে গুলি নিয়ে পালানোর চেষ্টাও করেছিলো বোধহয়, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। লাশের স্তুপের নিচে দু চারটা অর্ধমৃত দেহ করুণ আর্তনাদ করে আওয়াজ করছিলো।

সূর্য ওঠার পর সমস্ত স্কুলের আঙিনাটুকু যখন খাঁ খাঁ করছিলো তখন লোকজন গিয়ে তাদের মৃতদেহ গুলিকে টেনে বের করে এনেছিলো। এদের মধ্যে চারটি পরিবার হিন্দু ছিলো কিন্তু রক্তের স্রোতে তাদের আলাদা করার মত কোন পরিবেশ ছিলো না বিধায় সন্ধ্যায় কারফিউ জারির আগেই স্কুলের পাশে গণকবরে সমাধিস্থ করা হয়।

ত্রিশ-চল্লিশটার মত বাচ্চার লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরেছিলো স্কুল ঘরটায় আর তার বারান্দার মেঝেতে। সবগুলোর জন্য খোঁড়া হলো একটি কবর।

এর মধ্যে চারটে বাচ্চা, বয়স পাঁচ কি সাত মাস হবে, মায়ের রক্তের সাথে জমাট বেঁধে ছিলো প্রাণহীন পতুলের মত।

মান্নানের কাকা বলল, শান্তিবাহিনী মানুষ মারতে মারতে এদিকে আসতেছে বাহির হইস না।
এবার মান্নানের সত্যিই ভয় হলো। দৌঁড়ে গিয়ে মায়ের কোলে বসে। বাড়ির সবাই একটা ঘরে আতঙ্ক নিয়ে ফিসফিস করে কথা বলছে।

মান্নানকে জিজ্ঞেস করে, শান্তিবাহিনী কি এদিকে আসবে?

সেদিন তারা আসলো না।

কিন্তু মান্নানের বাবা পুরো গ্রামের লোকজনকে নিয়ে ছোট পাহাড়ি নদীটা পার হয়ে বাহাদুর সর্দারের গ্রামটিতে আশ্রয় গ্রহণ করে।

তাদের সাথে আরো চার পাঁচটি গ্রামের মানুষ গোমতি বাজারের একমাত্র পুলিশ ক্যাম্পটিকে ভরসা করে তার পাশেপাশে আশ্রয় গ্রহণ করে। দু’চারদিনের মধ্যে আরো কিছু মানুষ এসে জড়ো হতে থাকে। তার মধ্যে কয়েকটি গ্রামে শান্তিবাহিনী তাদের তাণ্ডব চালিয়ে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে।

দুদিন পর খবর আসেপাশের পাহাড়ি গ্রামগুলি থেকে একদল শান্তিবাহিনী পশ্চিম গড়গড়িয়া গ্রামে হানা দিয়েছে। অসংখ্য বাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে, কয়েকজনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেলো।

পুলিশের সদস্য আলী আকবর ক্যাম্প ইনচার্জের কাছে হামলা প্রতিহত করার অনুমতি চায়। কিন্তু শান্তিবাহিনীর ভারী অস্ত্রের ভয়ে তিনি অনুমতি দিতে রাজি হননি। পরে সম্ভবত পুলিশ সদস্যরা বিদ্রোহের ইঙ্গিত দিলে তিনি পাল্টা আক্রমণের অনুমতি দেন।

আট সদস্যদের পুলিশ টিমটি গ্রামের পেছন দিয়ে গিয়ে পলায়নরত শান্তিবাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়েন। পুলিশের সংখ্যা না জানা থাকায় তারা আর পুলিশের আক্রমণ প্রতিহত করার সাহস পায়নি। দ্রুত পালিয়ে যেতে গিয়ে মাঠের মাঝখানে দলের একজনের পায়ে গুলি লাগে, সাথে সাথে গগণ বিদারী চিৎকার দিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ে।

দলের সদস্যদের পালিয়ে যাওয়ার গতিতে বাঁধা পরল। এর মধ্যে শান্তিবাহিনীর দুই সদস্য তাকে চেংদোলা করে দলসহ দৌঁড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। থামবার উপায় ছিলো না একটুও। পুলিশ সদস্যরা গুলি করতে করতে এগুচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শান্তিবাহিনীর সদস্যরা ছোট নদীটা পার হয়ে দূরের পাহাড়িদের গ্রামটাতে মিশে গেলো।

আর নদীর পারে গুলিবিদ্ধ শান্তিবাহিনী সদস্যটির মস্তকবিহীন শরীরটি পরে ছিলো।
তাকে চিনে ফেলার আশঙ্কাতেই দলের বাকিরা তার মাথাটি কেটে সাথে করে নিয়ে যায়।

বহুদিনপর সেই গ্রামে আবারও হামলা হয়েছিলো তবে সতর্কতার কারণে সেবার প্রাণহাণি ঘটেনি খুব একটা।

শুধু গড়গড়িয়া গ্রামের একজন বৃদ্ধ লোক ছিলো বয়সের ভারে চলাফেরা করা করতে পারছিলো না, তার একমাত্র অবলম্বন ছিলো পরিবারের সর্বশেষ সদস্য তার বৃদ্ধা স্ত্রী। সারাদিন কয়েক গ্রামে হাত পেতে কয়েক মুঠো চাল আনলেই চুলায় আগুন জ্বলত তাদের।

সমস্ত গ্রামের মানুষগুলো যখন যার যার মত গ্রাম ছেড়ে চলে যায় সমস্ত গ্রামটায় অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করছিলো আর এই শতবর্ষী অসহায় বৃদ্ধ ছলছল দৃষ্টিতে পথ পানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে থাকতো কখন তার একমাত্র আপন মানুষটি লাঠিতে ভর দিতে দিতে বাড়ি আসবে, আর হাতে হাত ধরে গ্রাম থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাবে।

সমস্ত গ্রামের মানুষগুলো যখন প্রাণ বাঁচাতে গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছিলো, তখন অসহায় এই বৃদ্ধ তার প্রাণপ্রিয় বৃদ্ধা স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিলো। তার অপেক্ষার আর অবসান হয়নি, বাড়ি ফেরার পথের মাঝখানেই জীর্ণশীর্ণ কুঁচকে যাওয়া চামড়ার শরীরের বুড়িটার জীবনের অবসান ঘটল।

সম্ভবত একটু খানি ‘বাবা গো’ বলা আওয়াজ গুলির শব্দের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিলো।
তারপর সেই বৃদ্ধ কতদিন পথপানে চেয়ে অপেক্ষা করছিলো সেই খবর কারো কাছে নাই…….


  1. ঘটনার সময়কালঃ ১৯৮১ সাল।
  2. ঘটনার স্থানঃ গোমতি, থানা মাটিরাংগা, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা।
  3. কাহিনী বর্ণনায়ঃ প্রত্যক্ষদর্শী মো. আব্দুল মান্নান(৪৮)।
  4. ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেনঃ জনাব বাহাদুর সর্দার(৭৫)
Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 + 17 =

আরও পড়ুন