সুলতানি আমলে আলীকদম

fec-image

দুর্গম পাহাড়ের ভিতর বার্মা সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় মাতামুহুরী উপত্যকার প্রত্যন্ত গভীর অঞ্চল ছিলো আলীকদম। বিংশ শতাব্দির আশির দশকে সড়ক যোগাযোগের আগে এটি ছিলো অরণ্যঘেরা বিচ্ছিন্ন জনপদ। মধ্যযুগের বাংলায় এবং মোগল শাসনামলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে আলীকদম নামটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এতদাঞ্চলের প্রাচীন কিছু তথ্য-উপাত্ত গবেষণার দাবি রাখে।

মধ্যযুগে সুলতানি আমলে অরণ্য জনপদ আলীকদমের ইতিহাস বর্ণনার আগে কয়েকটি সূত্রের পরিচয় দেয়া প্রয়োজন। এ সূত্রগুলোর পরিচয়ের পর সুলতানি আমলে আলীকদমের ইতিহাস পর্যালোচনায় সহায়ক হবে। সূত্রগুলোর একটি হচ্ছে জোয়াও ডে বারোজের অংকন করা মানচিত্র। পুর্তগিজ ঐতিহাসিক জোয়াও ডে বারোজ ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে এ মানচিত্র অঙ্কন করেন। যাতে আরাকান, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার বিবরণ দেয়া হয়েছে।

অপরটি হচ্ছে ভারতবর্ষে মুসলিম অভিযান ও আরবদের সিন্ধু বিজয় থেকে ভারতে ‘মধ্যযুগের’ সূচনাকালের ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক ধারণা। আলীকদম নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হচ্ছে বাংলায় মোগল শাসনের ইতিহাস ও সমাপ্তি পর্ব। ‘মোগল আমলে আলীকদম’ শীর্ষক নিবন্ধে এ নিয়ে বিশদ আলোচনা হবে।

আমরা জানি, ভারতের মধ্যযুগের ইতিহাসে ‘সুলতানি আমল (১২০৪-১৫২৬ খ্রি.)’ এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। চট্টগ্রামে মুসলমান শাসন প্রবর্তিত হয় তারও প্রায় দেড়শত বছর পরে। সোনারগাঁও-এর স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ (১৩৩৮-১৩৪৯ খ্রি.) সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম জয় করেন।

১. ঐতিহাসিকের মতে, বখতিয়ারের নদীয়া জয়ের মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। অবশ্য বখতিয়ারের রাজ্যের সীমানা ছিল পূর্বে তিস্তা ও করতোয়া নদী, দক্ষিণে পদ্মা নদী, উত্তরে দিনাজপুর জেলার দেবকোট থেকে রংপুর শহর এবং পশ্চিমে বিহার পর্যন্ত। এর বাইরে বাংলার বিস্তৃত এলাকা তখনও মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহের শাসনকালে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ইসলাম প্রচার আরম্ভ হয় কিন্তু এটিই বাংলায় মুসলমানদের প্রথম আগমন নয়।

বাংলায় মুসলমানদের আগমন ঘটে ইসলামের প্রাথমিক যুগে। লালমনিরহাটে ৬৯ হিজরিতে প্রতিষ্ঠিত মসজিদের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কারের মাধ্যমে এই দাবি আরো শক্তিশালী হয়েছে। আরব ভূগোলবিদ ইবনে খুরদাদবা, সুলাইমান তাজির, আলইদ্রিসি কর্তৃক খ্রিষ্টীয় নবম ও দশম শতাব্দীতে রচিত বইপত্রে চট্টগ্রামের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ সময় বাণিজ্যিক কারণে আরব ব্যবসায়ীরা বাংলায় সফর করতেন। এরা ব্যবসার পাশাপাশি ইসলাম ধর্মের প্রচারক ছিলেন। ড. এম এ রহিম ও ড. এনামুলহকের মতে, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে আরব বণিকরা বসবাস করেছিলেন। সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে আরব মুসলিম বণিকরা চট্টগ্রাম-আরাকানঅঞ্চলে বাণিজ্য মিশন নিয়ে যাতায়াত শুরু করলেও অষ্টম শতাব্দীতে তাদের আগমন আরো বেড়ে যায়।

এ সময় চট্টগ্রাম ও আরাকানে আগত আরব বণিকদের সংস্পর্শে এ এলাকার মানুষ ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়। বণিকরা কেউ সপরিবারে আসেননি। অন্যদিকে মৌসুমী বায়ুর জন্য তাদেরকে ৫ থেকে ৬ মাস অপেক্ষা করতে হতো। এ সময় তারা স্থানীয় হিন্দু-বৌদ্ধ সম্পদায়ের মহিলাদের বিয়ে করতেন। বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ মহিলারা যেমন ইসলাম গ্রহণ করতেন তেমনি তাঁদের গর্ভস্থ সন্তানরাও ইসলামের সুমহান আদর্শকে গ্রহণ করেই বেড়ে ওঠেন।

এভাবে ক্রমশ আরব বণিক, বহিরাগত মুসলিম দরবেশ, সুফি, উলামা ও ইসলাম প্রচারকদের উৎসাহ-উদ্দীপনায় চট্টগ্রাম ও আরাকানে বসবাসরত নির্যাতিত হিন্দু ও বৌদ্ধরা ব্যাপক হারে ইসলাম গ্রহণ করে। ফলে চট্টগ্রামসহ মুসলিম পরিবারের সমন্বয়ে একটি মুসলিম সমাজ গড়ে ওঠে। দশম শতাব্দীতে সেখানে মুসলিম সমাজের প্রভাব এতটা বেড়ে গিয়েছিল যে, কোনো কোনো গবেষক একে ছোট খাট মুসলিম রাজ্য হিসেবে চিহ্নিত করে এর আমীরকে ‘সুলতান’ বলে আখ্যাদিয়েছেন। এ সুলতানের অধীনস্ত এলাকা ছিল মেঘনা নদীর পূর্বতীর থেকে নাফ নদীর উত্তর তীরবর্তী সমুদ্র উপকুলবর্তী ভূ-ভাগ পর্যন্ত।

এবার আসি মূল প্রসঙ্গে। সুলতানি আমলে অরণ্য জনপদ আলীকদমে কি গণ পদচারণা ঘটেছিল? কিংবা বাংলায় সুলতানি আমল শুরুর আগেই কি দক্ষিণ চট্টগ্রামে মুসলিম রাজত্বের প্রতিষ্ঠা ঘটে গিয়েছিল? ইতিহাস কী বলে?

এসব প্রশ্নের বিপরীতে ইতিহাসের ধারাবাহিক বিবরণ ও যুক্তিনির্ভর উত্তরপাওয়া হয়তো কষ্টসাধ্য। তবে দুষ্কর নয়! দশম শতাব্দীতে আরাকান সন্নিহিত দক্ষিণ চট্টগ্রামে মুসলিম সমাজের প্রভাবে ছোটখাট মুসলিম রাজ্যের সূচিত হয়েছিল বলে মনে করেন কোন কোন গবেষক। এ নিয়ে রয়েছে নানান তথ্য-উপাত্ত।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বহুগ্রন্থ প্রণেতা গবেষক আতিকুর রহমান তার এক অনুসন্ধানী সন্ধর্ভে ‘আলীকদম’ নামকরণ ও ‘আলীর পাহাড়’ কে মুসলিম
ঐতিহ্যমÐিত বলে অভিহিত করেছেন।

২. তার মতে বাস্তবেই এতদাঞ্চল প্রাচীনমুসলিম অধিকৃত এলাকা। তিনি বলেন, বিস্মিত হলেও এখানকার প্রাচীনমুসলিম আধিপত্য অল্প বিস্তর ইতিাহসে উল্লেখ আছে। আরকানের রাজা ইঙ্গ চন্দ্র ৯৫৩ ইং সালে জৈনক ‘সুরতান’ কে তাড়া করে চট্টগ্রামের দিকে অভিযান করেছেন এবং এ অভিযানে কুমিরার কাওনিয়াছড়া পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চল তার দখলীভূতহয়। ‘সুরতান’ আরবি সুলতান শব্দেরই মঘীবিকৃতি। যার বাংলা প্রতিশব্দ হলো রাজা।

এটাই প্রমাণ: বাংলায় মুসলিম সুলতানি আমল শুরু হওয়ার প্রায় ৩ শত বছর আগে দক্ষিণ চট্টগ্রামে মুসলিম রাজত্বের প্রতিষ্ঠা ঘটে গিয়েছিলো। ১৩৩৯-৪০ খ্রিস্টাব্দে সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ্ধসঢ়; প্রথম এ অঞ্চল বাংলা সালতানাতের অন্তর্ভূক্ত করেন।

৩. ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৪৩০-১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সুদীর্ঘএকশত বছর বাংলার ইলিয়াস শাহী রাজবংশের অধীনে ছিলো আরাকান। আরাকানেররাজ্য সীমা তৎসময়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আরাকনের রাজারা সুলতানীআমলে বাংলার শাসকদের নিয়মিত কর প্রদান করতেন। এ সময়কার ইতিহাসের এটাও।

জানা যায় যে, ১৪৩০-১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আরাকানে ১৭ জন রাজা তাঁদেরশাসকার্য পচিালনার সুবিধার্থে মুসলমানি নাম ধারণ করেন। ১৪৪০ খ্রিষ্টাব্দে আরাকানের যুব রাজ নরমিখলা বাংলার প্রথম রাজধানী গৌড়ীয় সৈন্যবাহিনীর সহায়তায় ‘সোলাইমান শাহ’ নামধারণ করে ¤্রাউক-উরাজ বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময়কার আরাকানের রাজা মেংখারি (১৪৩৪-১৪৫৯খ্রি.) এর মুসলমানি নাম ছিল ‘আলী খাঁ’ এবং রাজা থাটাসা ((১৫২৫-১৫৩১খ্রি.) এর মুসলমানি নাম ছিল ‘আলী শাহ্ধসঢ়;’। ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে আরাকানের রাজা নরমিখলা বর্মী রাজা কর্তৃক রাজ্যচ্যুতহন। পরে তিনি সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের আশ্রয় গ্রহণ করেন। ২৪ বছরপর ১৪৩২ খ্রিস্টাব্দে সুলতান জামাল উদ্দিনের সহায়তায় তিনি স্বরাজ্য পূণর্দখলকরেন। সে অভিযানকালে দক্ষিণ চট্টগ্রামে কোন বিজাতীয় শাসন থাকলে নির্বিবাদে তা ডিঙ্গিয়ে আরকান দখল করা সম্ভব হতো না।

৪. রাজা নরমিখলার রাজ্য প্রতিরক্ষায় সুলতানের সৈন্যরা তথায় ঘাটি স্থাপন করেন। রাজ্য পরিচালনায় তখন মুসলিম আমলাদের নিযুক্ত করা হয়। ওদের সঙ্গী সাথী হয়েআরাকানের সাধারণ বাঙ্গালীরাও ভাগ্যান্বেষণে বিপুল সংখ্যায় যায়। এ প্রভাবে গোটা দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্তবর্তী শঙ্খ, মাতামুহুরী ওনাফ নদী হয়ে পড়ে বাঙালি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা। পরে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ১৫১২ সালে গোটা চট্টগ্রাম নিজ দখলে আনেন। খোদা বখশ্ধসঢ়; খান ছিলেন তার অধীনে দক্ষিণ চট্টগ্রাম অঞ্চলের শাসক। এ প্রশাসনিক এলাকার সদর দফতর ছিলো আলীকদম।

১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে অংকরন করা মি. বারোজের মানচিত্রে এ আলীকদম রাজ্য ও খোদা বখশ্ধসঢ়; খানের কথা পরিস্কার ভাবে ব্যক্ত আছে। খোদা বখ্ধসঢ়;শ খানের রাজ্যটি পাহাড় আর অরণ্যানী ঘেরা ছিল বলে মানচিত্রে অনুমিত হয়। খোদা বখ্ধসঢ়;শ খান ছিলেন গৌড় সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহর (১৪৯৩-১৫৩৮ খ্রি.) প্রতিনিধি।

আধুনিক আলীকদম এ তৈনছড়ি খাল উপকূল ছিল তাঁরই শাসনাধীন। তাই সঙ্গতভাবেই বলা যায় যে, উত্তর আরাকানবাসী জুমিয়ারা স্থানান্তর ও আনুগত্যের মাধ্যমে মুসলিম সামস্ত খোদা বখ্ধসঢ়;শ খানের প্রজা ও মিত্র ছিল। সম্ভবত তখন থেকেই তারা (উপজাতীয় জুমিয়ারা) মুসলিম প্রভাবাধীন হয়ে মাতামুহুরী ও আলীকদম এলাকায় বসবাস করে। ১৫৩১-১৫৩২ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম গৌড়ের সুলতান হোসেন শাহের পুত্র নসরত শাহের শাসনাধীনে ছিল। ১৫৩৩ থেকে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চট্টগ্রাম গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহের শাসনাধীন ছিল।

শেরশাহ বংশের পতনের পর ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম বাংলার স্বাধীন সুলতান সামশুদ্দিন মোহাম্মদ শাহ গাজীর শাসনাধীন ছিল। তিনি আরাকান জয় করে সেখানকার রাজধানী থেকে মুদ্রা উৎকীর্ণ করেন।

গৌড়ে সুর বংশের পতনের পর কররানী বংশের প্রতিষ্ঠা হয়। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে সোলায়মান কররানী গৌড়ের সুলতান হন। তার মৃত্যুর পর পুত্র দাউদ কররানী (১৫৭২-১৫৭৬ খ্রি.) গৌড়ের সুলতান হন।

৫. তিনি ১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম পুনরুদ্ধার করার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। ত্রিপুরা বাহিনীকে পরাজিত করে তিনি পুনরায় চট্টগ্রাম অধিকার করেন। দাউদ কররানী চট্টগ্রামের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদঢ় করার উদ্দেশ্যে জামাল খাঁ পন্নী ও ফিরোজ খাঁ পন্নীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামে আরও সৈন্য পাঠান। ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে দাউদ কররানী নিহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে আফগান শাসনের অবসান ঘটলেও কিন্তু কেন্দ্রীয় শক্তিবিহীন চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্ন আফগান শাসক জামাল খান পন্নী ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত উত্তরে ত্রিপুরা, দক্ষিণে আরাকান পর্যন্ত চট্টগ্রামের শাসন বহাল রাখেন। অবশেষে ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্ন আফগান শাসনের পতন হয়।

৬. ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে আরাকানরাজ দক্ষিণ চট্টগ্রাম অধিকার করেন। পরবর্তীকালে উত্তর চট্টগ্রামও আরাকান রাজ্যভুক্ত হয়। তখন থেকেই ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দ অবধি পঁচাশি বছরকাল আরাকানের সাতজন রাজা একাক্রমে চট্টগ্রাম শাসন করেন।

৭. ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দে খোদা বখ্ধসঢ়;শ খান থেকে ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে জামাল খান পন্নীর সময়কাল পর্যন্ত সাতাশি বছরে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম মুসলিম শাসন বলবৎ ছিল এবং এখানে মুসলিম সমাজ-সংস্কৃতির প্রভাব ব্যাপকভাবে পড়ে। এই সময়ে চট্টগ্রামের দক্ষিণ অঞ্চওে মগ বসতি এবং উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে রিয়াং ওকুকিদের আনাগোনা পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া অন্যান্য উপজাতির বসবাস সম্পর্কে কোন প্রকারের তথ্য-উপাত্ত সমসাময়িককালের কোন ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে যারাই চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে বিচরণ করতো তারা চট্টগ্রামীদের কাছে মগ নামেই পরিচিত ছিল।

৮. ‘আলীকদম’ একটি প্রাচীন জনপদ ছিল তার একটি ধারণা ও তথ্য পাওয়া যায় ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগীজ ইতিহাসবিদ জোয়াও জে বারোজের মানচিত্রটি প্রাচীনতম। যাতে আধুনিক কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলা স্থান পেয়েছে ভিন্ন নামে। ওই মানচিত্রে একটি নদীর উল্লেখ আছে। কিন্তু নদীর নাম মানচিত্রে নেই। নদীটি অবশ্যই কর্ণফুলী। সেই নদীর দক্ষিণে বিস্তীর্ণ এলাকাটি ESTADO Do CODAVASCAM নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর দক্ষিণাংশে Reino de Arakan বা আরাকান রাজ্য। মানচিত্রে উল্লেখিত CODAVASCAM মানে এ অঞ্চলের শাসক খোদা বক্স খানকে বুঝানো হয়েছে বলে ঐতিহাসিকরা মত দিয়েছেন। মানচিত্রে খোদা বক্স খানের এলাকা গাছপালায় ভর্তি পার্বত্য অঞ্চলরূপে দেখানো হয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে, ESTADO Do CODAVASCAM ‘খোদা বক্স খান’ এর শাসিত এস্টেট বা এলাকা ছিল এটি। তবে CODAVASCAM এর শাসিত রাজ্যে স্থানের নাম বেশি নেই।

মানচিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, এতে স্থলভাগের অভ্যন্তরে Sundar, Tanson, Santotoly and Sore নামে কয়েকটি নাম চিহ্নিত আছে। তবে এসব নামের এখন অস্তিত্ব নেই। সম্ভবত পার্বত্য জনবসতি বৃদ্ধির কারণে মানচিত্রে উল্লেখিত স্থানের নাম পরিবর্তন হয়েছে।

পার্বত্য গবেষক আতিকুর রহমানের মতে, ‘আলীকদম’ এর পর্তুগীজ ভাষ্য ‘কভাস ডোকাম’। জোয়াও ডে বারোজের আঁকা মানচিত্রের ‘কভাস ডোকাম’ অঞ্চলের শাসক ছিলেন কবাস কাম (খোদা বখ্শ খান)। তাঁর এ তথ্যের ধারণার মিল পাওয়া যায় মানচিত্রে ‘কবাস ডোকাম’ এর পশ্চিমে পাশে স্থান পেয়েছে ‘‘Chocoria’ অর্থাৎ বর্তমান চকরিয়া উপজেলার অবস্থান। বৃহত্তর কক্সবাজার জেলার উপকুলীয় অঞ্চলকে ‘‘Chocoria’ নামে চিহ্নিত করেন মিঃ বারোজ। আধুনিক মানচিত্রে বৃহত্তর কভাস ডোকামের পশ্চিমে রয়েছে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলা। মানচিত্রে অনুমিত হয় যে, পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামর্ চকরিয়া (‘Chocoria) নামে পরিচিত ছিল।

মানচিত্রটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এ মানচিত্রে ব্রহ্মদেশকে রেইনো ডেব্রোমালিমা, আরাকানকে রেইনো ডে আরাকাম এবং ত্রিপুরাকে রেইনো ডে টিপোরা এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকা ঘিরে আরাকান পর্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলকে ইস্টাডো কোভাস ডোকাম বলা হয়েছে।

মি. বারোজের মানচিত্রটি ভালোভাবে লক্ষ্য করলে বুঝা যায় যে, বঙ্গোপসাগরের উপক‚ ল ঘেষেই রেইনো ডে আরাকাম অবস্থিত। এত দাঞ্চলের তিন নদী তথা শঙ্খ, মাতামুহুরী ও নাফের মধ্যবর্তী অঞ্চল নিয়ে ইস্টাডো কোভাস ডাকোম নামীয় এলাকাটি পূর্বেও পাহাড় থেকে পশ্চিমের সমুদ্রেরে উপক‚ ল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই অঞ্চলটির ভিতরই কোদা ভোস কাম নামটি মুদ্রিত। উক্ত কোভাস ডোকামের পূর্বে বর্ণিত দুই উপনদীর উৎস মুখে চাকোমা নামীয় অঞ্চলটি পড়ে। তাতে রেইনো বাইস্টাডো শব্দের প্রয়োগ নেই, যা রাজ্য বা রাষ্ট্র অর্থ জ্ঞাপক।

সুতরাং চাকোমা নামীয় জায়গাটি এ নামের সম্প্রদায় অধ্যুষিত অঞ্চল বলেই বুঝা যায়, যা কোনস্বাধীন রাজ্য বা রাষ্ট্র নয়।মনে হয় ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে কর্ণফুলী থেকে নাফ নদী পর্যন্ত মধ্যবর্তী অঞ্চলের সমতল উপত্যকা ও পূর্বের পার্বত্যাঞ্চলসহ ‘কোভাস ডোকাম’ বা‘আলীকদম’ নামীয় অঞ্চলটি খোদা বখ্ধসঢ়;শ খান বা তার বংশের দ্বারা শাসিত রাজ্য ছিলো। তারই পূর্ব উত্তর সীমান্তে চাকোমা অঞ্চল, যা বার্মার ভৌগোলিক সীমানায় পড়ে। পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা ও আরাকানের অবস্থানের দ্বারাও নির্ণীত হয় যে, বর্ণিত চাকোমা অঞ্চলটি বাংলার অভ্যন্তরে পড়ে না। সুতরাং অঞ্চলটি চাকমা কথিতউত্তর আরাকানের মইসাগিরি বলেই অনুমিত হয়। মানচিত্রটিতে চাকোমা অধিবাসীদের স্বীকৃতি আছে , স্বাধীন রাজ্য বা রাষ্ট্রের নয়।

আরাকানের কিংবদন্তী ও ইতিহাসের বর্ণনায় কথিত মইসাগিরিতে চাকমাদের আধিপত্যথাকার কথা বর্ণিত হয়েছে, যাকে স্বাধীন সার্বভৌম রাজ্য হতে হলে, তার প্রতীকমুদ্রা ও আন্তঃ রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের প্রমাণাদির অধিকারী হতে হবে, যা এখনপর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

৯. জোয়াও ডে বারোজ এর মানচিত্রের ‘কোভাস ডোকামে’ আদৌ গণপদাচরণা ঘটেছিল কিনা নিশ্চিত হওয়া যায় না। তবে এ অরণ্য জনপদে সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের পর মোগল শাসনের আওতায় আসে এবং জনবসতি শুরুহয় তা এক প্রকার নিশ্চিত করে বলা যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা জাতির ইতিহাস সূত্রেও জানা যায়, আলীকদম একটি প্রাচীন জনপদ। এছাড়াও মোগল বাহিনীর আলীকদম আগমণেরঘটনা পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণসংযোজন। এ ইতিহাসকে জানতে হলে গভীর অনুসন্ধিৎসা নিয়ে প্রাচীন বাংলার সুলতানি আমল ও মোগল ইতিহাসের পাঠ ছাড়া গত্যান্তর নেই। এখন কথা হচ্ছে যে, মধ্যযুগে কিংবা প্রাচীন বাংলার এ অরণ্যানীতে কিংবা এর কাছাকাছ কোথাও মুসলিম শাসনের শুরু হয়েছিল? আদৌ কি এতদাঞ্চলে মানব বসতির সূচনা ঘটেছিল? তা জানতে হলে আবারো মি. বারোজের আঁকা ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দের সেই মানচিত্র পর্যালোচনা দাবি রাখে।

ঐতিহাসিক জোয়াও ডে বারোজের মানচিত্রে প্রদর্শিত ‘কোভাস ডোকাম’ নামটি, মাতামুহুরী নদীর উজানের বহুল পরিচিত ‘আলীকদম’ নামের পর্তুগীজ ভাষা হওয়া সম্ভব। অনুরূপ সঙ্গতিপূর্ণ নামধারী কোন দ্বিতীয় জায়গা এখন নেই। মানচিত্রে লেখা ‘কোদা ভোসকাম’ নামটি ও সুলতানী আমলের দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ‘খোদা বখ্ধসঢ়;শ খান’ বলে অনুমান করা যায়।

যেহেতু ঐ মানচিত্রে বার্মাকে বলা হয়েছে ব্রেমা লিমা, সিলেটকে সিরোট, কুমিল্লাকে কমোটেইল, কচবিহারকে কসপেটার ইত্যাদি। সেহেতু ‘আলীকদম’কে কোভাস ডোকাম বলা সম্ভব। মানচিত্রের দ্বারা অনুমিত হয়, ‘কোভাস ডোকাম’ বা ‘আলীকদম রাজ্য’টি বঙ্গোপসাগর উপকূল থেকে চীন পর্বত্যাঞ্চল পর্যন্ত কর্ণফুলী ও নাফের মধ্যাঞ্চল নিয়ে গঠিত। জানা যায়, প্রাচীনকালে আলীকদমে প্রাচীন দালান কোঠা ও স্থাপনা বিদ্যমান ছিলো। রক্ষণাবেক্ষণ ও অসচেতনার অভাবে সেগুলো এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত। যার শেষ পূর্ব ও উত্তর প্রান্তে অবস্থিত চাকোমা অঞ্চল।

চাকমাদের ঐতিহাসিক কিংবদন্তি অনুযাযী, ‘আলীকদম’ হলো তাদের অন্যতম রাজ্য ও রাজধানীর নাম। চাকমারা ধর্মীয় পরিচয়ে অমুসলিম। আলীকদমকে তারা নিজেদের রাজ্য ও রাজধানী বলে দাবী করলেও, মি. বারোজের বর্ণিত আলীকদমের অধিপতি ছিলেন খোদা বখ্ধসঢ়;শ খান বা তদীয় বংশধরেরা। কিন্তু চাকমা ইতিহাসে খোদা বখ্ধসঢ়;শ খান তাদের রাজা বলে স্বীকৃত নন। এখানে স্মর্তব্য যে, প্রাচীনকালে চাকমা অধ্যুষিত বহুল কথিত তৈনছড়ি বা তৈনখাল এলাকাটিও আলীকদম সদরেই অবস্থিত।

মি. বারোজের বর্ণনাকে স¤প্রতি উদ্ঘাটিত ঐতিহাসিক তথ্যাদি, সম্পূর্ণ সত্য বলে স্বীকৃতি প্রদান করে। শত শত বছর আগের ঐ রাজা প্রজাদের ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয় হুবহু উদ্ঘাটন বা নির্ণয় কঠিন হলেও, এখন তা আভাসে ইঙ্গিতে কল্পনীয়। নাম খেতাব ও রাজত্বে ও প্রতিনিধিত্ব গুণে, খোদা বখ্ধসঢ়;শ খান ও আলীকদম রাজ্যের চরিত্র খাঁটি মুসলিম। সোনারগাঁর মুসলিম সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহই ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম চট্টগ্রামকে বাংলার মুসলিম রাজত্বভুক্ত করেন। ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ২৬ বছর কাল তা পুনরায় আরাকানী মগ দখলাধীন থাকে। তৎপর ত্রিপুরার রাজা ধন্যমানিকা কর্তৃক অধিকৃত হয়। যার দখল থেকে ১৫১২ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্ধসঢ়; নিজ রাজ্যভ‚ক্ত করেন। ঐ গৌড় সালতানাতের দখলাধীন চট্টগ্রামে নিম্নোক্ত মুসলিম শাসনকর্তারা প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন,

যথা:

ক. মীরশ্বরাই অঞ্চল, পরাগল খাঁ ও ছুটি খা, খ. সীতাকুন্ড অঞ্চল হামিদ খাঁ, গ. ফতেহাবাদ অঞ্চলঃ হামজা খাঁ, ঘ. দক্ষিণ চট্টগ্রাম অঞ্চল খোদা বখ্ধসঢ়;শ খাঁ।

১০. এখানে মি. বারোজের বর্ণনাভুক্ত খোদা বখ্ধসঢ়;শ খানের প্রত্যক্ষ সমর্থনে ইতিহাস সোচ্ছার। তিনি গৌড় সালতানাতের অধীন দক্ষিণ চট্টগ্রামের শাসনকর্তা। বর্তমানে আমরা বারোজের মানচিত্রের মাধ্যমে জানতে পারছি যে, ঐ অঞ্চলের স্থানীয় নাম ছিল ‘কোভাস ডোকাম’ বা ‘আলীকদম’। চাকমা জাতীর ইতিহাসে আলীকদম একটি প্রাচীন রাজ্য। খোদা বখ্ধসঢ়;শ খান বা তার বংশীয়রা চাকমাদের জনপ্রিয় আশ্রয়দাতা হিসেবে রাজা সম্বোধিত হয়ে থাকবেন। এখানে ঐ রাজা-প্রজাদের এক ধর্ম বা এক সমাজ হওয়া অপরিহার্য নয়।

চাকমা লোকশ্রæতি অনুসারে বর্ণিত ঐ চাকোমা অঞ্চলে তাদের অন্যত প্রাচীন রাজ্য মইসা গিরি বা মনিজা অবস্থিত ছিলো বলে ধারণা করা যায়। উত্ত আরাকানে সম্ভবত তাদের শক্তি ও সামর্থ্যে সন্দিহান হয়ে, আরাকানের মগ রাজশক্তি ঐ চাকমা জনগোষ্ঠীকে উৎখাত করেন এবং তারই পরিণতিতে তারা বিপরীত দিকে অবস্থিত ‘সুলতানী এলাকা আলীকদম’, ও তার সন্নিহিত অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণে বাধ্য হন।

১১. মোগল আমলে ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দের পর অরণ্য জনপদ গিরিনন্দীনি ‘আলীকদম’ এর নামকরণ, জনবসতি স্থাপন, মোগল বাহিনীর জমিদারী প্রতিষ্ঠা, ১৭২৪ সালে এ জনপদে মোগল জমিদারির পতনের সূচনা এবং ১৬৩৭ সালের পর আলীকদম থেকে পুরোপুরিভাবে মোগল সৈন্যরা চলে যায়।

তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে, এককালের অরণ্য জনপদ ‘আলীকদম’ সুলতানী আমল ও মোগল আমলে ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হিসেবে বিবেচিত। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েকটি জাতী-গোষ্ঠীর আগমণ-নির্গমনের ইতিহাসের সাথেও আলীকদম
নামটি জড়িয়ে আছে।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আলীকদম, স, সুলতানি আমল
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

six − 4 =

আরও পড়ুন